মৃত্যুর আগে যা বলে গেলেন ইসলামে দীক্ষিত ক্যাথলিক যাজক

রোমান ক্যাথলিক যাজক ইদ্রিস তৌফিক। প্রায় ১৫ বছর আগে তিনি কিসের টানে ইসলামে ধর্মান্তরিত হন তার সেই অভিজ্ঞতা সবার সঙ্গে শেয়ার করেছেন। তিনি ২০১৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে অসুস্থতাজনিত কারণে যুক্তরাজ্যে মারা যান। তিনি বেশ কয়েক বছর যুক্তরাজ্যের বিভিন্ন স্কুলে ধর্মীয় শিক্ষার প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।

পড়ুন তার সেই আশ্চর্যজনক কাহিনী যা তিনি মৃত্যুর আগে নিজের জীবন সম্পর্কে লিখে গেছেন:

‘আমি একজন যাজক হিসেবে কয়েক বছরমানুষের সেবা করেছি এবং তা আমি উপভোগ করেছি। যাইহোক, এর পরেও ভিতরে ভিতরে আমি খুশি ছিলাম না এবং আমার কাছে কেবল মনে হয়েছে, সেখানে কিছু একটা সঠিক নয়। সৌভাগ্যবশত এবং আল্লাহর ইচ্ছায় আমার জীবনে ঘটে যাওয়া কিছু ঘটনা কাকতালীয়ভাবে আমাকে ইসলামের পথে নিয়ে যায়।’

‘আমার ধারনা ছিল মিশর হচ্ছে পিরামিড, উট, বালি এবং খেজুর গাছের দেশ। আসলে আমি মিশরের হূর্ঘদায় একটি সফরে গিয়েছিলাম। এটা মিশরের প্রধান পর্যটন কেন্দ্র এবং দেশটির দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর। শহরটি লোহিত সাগর উপকূলে অবস্থিত।’

‘এটা অনেকটা ইউরোপীয় কিছু সমুদ্র সৈকতের অনুরূপ যা আমাকে বিস্মিত করেছিল। আমি প্রথমে বাসযোগে কায়রো যাই। সেখানে আমি আমার জীবনের সবচেয়ে বিস্ময়কর একটি সপ্তাহ অতিবাহিত করি। প্রথমবারের মতো আমি সেখানে ইসলাম ও মুসলমানদের সান্নিধ্যে আসি। সেখানে আমি খেয়াল করলাম মিশরীয়রা কতটা ভদ্র ও ভাল মানুষ কিন্তু খুবই শক্তিশালী।’

‘ওই সময় মুসলমানদের সম্পর্কে সব ব্রিটিশদের মতো আমার চিন্তাধারাও ছিল একই রকম। মুসলিমরা হচ্ছে বোমাবাজ ও যোদ্ধা যা মিডিয়া ও টিলিভিশন থেকে বারবার শুনে অভ্যস্ত হয়ে গেছি। অন্য সবার মতো আমারও ধারনা ছিল, ইসলাম একটি অশান্তির ধর্ম। তবে কায়রোতে এক সপ্তাহ অতিবাহিত করার পর আমি আবিষ্কার করলাম ইসলাম কতটা সুন্দর ও শান্তির ধর্ম।’

‘মসজিদ থেকে আজানের শব্দ শুনতে পেয়ে রাস্তায় পণ্য বিক্রি করা অত্যন্ত সাধারণ মানুষগুলো তাদের বেচাকেনা ফেলে রেখে আল্লাহ দিকে তাদের মুখ নির্দেশ করে মুহূর্তের মধ্যে নামাজে দাঁড়িয়ে যেতে দেখেছি। আল্লাহর প্রতি তাদের দৃঢ় বিশ্বাস আমাকে মুগ্ধ করে। মৃত্যুর পর স্বর্গ লাভের প্রত্যাশায় তারা নিয়মিত নামাজ পালন, রোজা পালন, অভাবগ্রস্তকে সাহায্য করা এবং মক্কায় গিয়ে হজ পালনের স্বপ্ন দেখে।’

‘সেখান থেকে প্রত্যাবর্তনের পর আমি আমার পুরানো পেশা ধর্মীয় শিক্ষার কাজে ফিরে যাই। ব্রিটিশ শিক্ষা ব্যবস্থায় একমাত্র বাধ্যতামূলক বিষয় হচ্ছে ধর্ম শিক্ষা অধ্যয়ন। আমি খ্রিস্টান, ইসলাম, ইহুদীধর্ম, বৌদ্ধ এবং অন্যান্য ধর্ম সম্পর্কে শিক্ষা দিতাম। তাই প্রতিদিন আমাকে এসব ধর্ম সম্পর্কে পড়তে হতো। আমার ছাত্রদের অনেকে ছিল আরবের মুসলিম শরণার্থী। অন্য কথায়, ইসলাম সম্পর্কে শিক্ষা দিতে গিয়ে আমি এ ধর্ম সম্পর্কে আমি অনেক কিছু শিখতে পারি।’

‘সাধারণত কিশোর-কিশোরী বয়সে অনেক ছেলে-মেয়েই কিছুটা দুষ্ট প্রকৃতির হয়ে থাকে। কিন্তু এই আরব মুসলিম শরণার্থী শিশুরা ভাল মুসলামানের উদাহরণ স্থাপন করে। এই ছাত্র-ছাত্রীরা ছিল খুবই ভদ্র এবং দয়ালু। তাই তাদের সঙ্গে আমার বন্ধুত্ব গভীর হতে থাকে। রমযান মাসে নামাজের জন্য আমার শ্রেণীকক্ষ তারা ব্যবহার করতে পারবে কিনা সেসম্পর্কে তারা আমার মতামত জিজ্ঞাসা করে।’

‘সৌভাগ্যবশত কেবল আমার রুমটিতেই কার্পেট বিছানো ছিল এবং কার্পেটের ওপর শিশুদের মাসব্যাপী নামাজ পড়ার অনুমতি দেই। আর আমি প্রতিদিন পিছে বসে তাদের প্রার্থনা পর্যবেক্ষক করতাম। এটা আমাকে তাদের সঙ্গে রমজানের রোজা রাখতে উৎসাহ যুগিয়েছিল। যদিও আমি তখনো পর্যন্ত মুসলিম ছিলাম না।’

‘একবার ক্লাসে পবিত্র কোরআনের একটি অনুবাদ আবৃত্তি করতে গিয়ে আমি একটি আয়াতে পৌঁছাই। এতে বলা আছে, {আর যখন তারা আমার রাসূলের মাধ্যমে যা অবতীর্ণ হয়েছে তা শোনে, তখন তুমি দেখতে পাবে তাদের চোখে অশ্রু টলমল করছে কারণ তারা সত্যের স্বীকৃতি দিয়েছে} (কোরআন ৫:৮৩)’

‘আমি আবেগে বিস্মিত হয়ে যাই। আমি অনুভব করলাম আমার চোখে অশ্রু ছলছল করছে এবং আমি শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে তা আড়াল করতে কঠোর চেষ্টা করলাম।’

‘পরেরদিন আমি আন্ডারগ্রাউন্ডে যাই এবং সেখানে গিয়ে খেয়াল করলাম মানুষ ইসলাম সম্পর্কে কতটা আতঙ্কগ্রস্ত। ব্রিটেনে মানুষের এই ধরনের মনোভাবে আমি ভয় পেয়ে যাই। ওই সময়ে পশ্চিমারা এই ধর্ম নিয়ে ভয় পেতে শুরু করে এবং তারা এটিকে সন্ত্রাসবাদের জন্য দায়ী করে।’

‘তবে মুসলমানদের সঙ্গে আমার আগের অভিজ্ঞতার কারণে আমাকে একটি ভিন্ন দিকে নিয়ে যায়। আমি ভাবতে শুরু করি, কেন ইসলাম? কেন আমরা কিছু মানুষের সন্ত্রাসীদের কর্মের জন্য ধর্ম হিসেবে ইসলামকে দোষারোপ করি। যখন কিছু খ্রিস্টান একই কাজ করছে; তখন কেন কেউ খ্রিস্টধর্মকে সন্ত্রাসবাদের ধর্ম বলে অভিযুক্ত করে না?’

‘এই ধর্ম সম্পর্কে জানতে আমি একদিন লন্ডনের সবচেয়ে বড় মসজিদে যাই। লন্ডনের কেন্দ্রীয় মসজিদের প্রবেশ পথে আমি ইউসুফ ইসলামকে পাই। তিনি ছিলেন একজন পপ গায়ক। সেখানে বৃত্তাকারে বসে ইসলাম সম্পর্কে কিছু মানুষের কথা বলা শুনলাম। একটা সময় আমার মন আমাকে জিজ্ঞাসা করতে থাকে, ‘তুমি কি সত্যিই একজন মুসলিম হতে চলেছ?’

‘সেখানে আমাকে একজন বললেন, মুসলমানেরা এক আল্লাহর ওপর বিশ্বাস করে, প্রতিদিন পাঁচবার প্রার্থনা করে এবং রমজান মাসে রোজা পালন করে। আমি তাকে এই বলে থামিয়ে দিলাম, আমি এর সবই বিশ্বাস করি এবং এমনকি রমজানে আমি রোজাও রেখেছি।’

‘তখন তিনি আমাকে বললেন, ‘তাহলে আপনি কিসের জন্য এখনো অপেক্ষা করছো? কি আপনাকে এ পথে আসতে বাধা দিচ্ছে?’ আমি বলেছিলাম, ‘না, আমি ধর্মান্তরিত হতে মনস্থ করি নি।’

‘সেই মুহূর্তে মসজিটিতে আযান দেয়া হলে সবাই প্রস্তুত হয়ে লাইনে দাঁড়িয়ে নামাজে দাঁড়িয়ে যায়। আর আমি পিছে বসে অনবরত ক্রন্দন করতে লাগলাম। তারপর আমি নিজেকে বললাম, ‘আমি মূর্খের মতো কি করছি?’ ‘তাদের নামাজ শেষ হলে আমি ইউসুফ ইসলামের কাছে যাই এবং তাকে অনুরোধ করি আমাকে কালেমা শিক্ষা দেয়ার জন্য; যাতে আমি ইসলামে ধর্মান্তর হতে পারি।

তিনি প্রথমে আমাকে ইংরেজিতে কালেমার অর্থ ব্যাখ্যা করে শোনান। পরে আমি তার সঙ্গে সঙ্গে আরবিতে এটি পাঠ করি। এর অর্থ হচ্ছে, আল্লাহ ব্যতীত কোন উপাস্য নেই এবং মুহাম্মাদ (সা.) আল্লাহর রাসূল।’

‘কালেমা পাঠ করার পরে আমি আমার চোখের পানি ধরে রাখতে পারি নি।’

অকাট্যতা

“যাই হোক, তুমি যতই বুদ্ধিমান হও না কেন – আমার এমন কিছু প্রশ্ন আছে যেগুলোর উত্তর আমাকে এখনও পর্যন্ত কেউ দিতে পারে নি। তুমিও দিতে পারবে না। আর যারা দিয়েছে তারা আমাকে সন্তষ্ট করতে পারে নি। আমার প্রশ্নগুলোর অকাট্য উত্তর কেউ দিতে পারলে আমি আস্তিক হয়ে যেতাম। তোমাকে বলি শোন…”

“দাঁড়াও দাঁড়াও… এত তাড়াহুড়ো কীসের? আমি তো এসেছি কেবল মেহমানের সাথে দেখা করতে – আরমানের চাচাত ভাই বলে কথা। চল চল, কথা যদি বলতেই হয়, চা খেতে খেতে বলা যাবে।”

আরমান আর ওর ভাই দুইজনেই বিরক্ত হল। যেন ওরা একদমই ধরে নিয়েছিল যে আমি এসব নাস্তিকতা নিয়েই কথা বলতে এসেছি। দুজনের মুখ দেখেই মজা পেলাম। আরমান রেগেছে কারণ ওর আসলে তর সইছে না।

চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে আমিই শুরু করলাম, “তুমি বলছ তোমার এমন কিছু প্রশ্ন আছে যেগুলোর উত্তর কেউ দিতে পারে নাই; আর তোমার ধারণা আমিও দিতে পারব না, তাই তো? মানে The absolute question বা questions, ঠিক?”

“হ্যাঁ, আমি তাহলে শুরু করি…”

“তোমার প্রশ্ন আমার শোনা লাগবে না! সেটা তাকদীর বা ভাগ্য নিয়ে নাকি পাত্থর নিয়ে আমার তা জানা লাগবে না। শুধু শুনে যাও। মুসলিমদের পক্ষ থেকে The Absolute Answer বা অকাট্য উত্তরের বৈশিষ্ট্যই এমন… প্রশ্নই শোনার প্রয়োজন নেই।”

মানুষকে মাঝে মাঝে অবাক হতে সময় দিতে হয়, তানাহলে পরবর্তী ঘটনা বা কথায় মনোযোগ কমে যাবার আশাংকা থাকে। তাই একটু থেমে আবার বলতে শুরু করলাম।

“শুনে রাখ, আমরা আল্লাহ সুবহানাহুর ওপর দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস স্থাপন করেছি তাঁকে না দেখেই। কোনও প্রমাণ ছাড়াই। আল্লাহ রব্বুল আ’লামীন কুরআনের শুরুতেই সূরা বাকারাহের ২য় ও ৩য় আয়াতে বলেছেন তাঁর কিতাব তাদেরই পথপ্রদর্শক ‘যারা অদেখা বিষয়ে বিশ্বাস স্থাপন করে’, এর তাৎপর্য হল এই যে, কিছু মানুষ কখনোই বিশ্বাস করবে না। এমনকি তাদেরকে চাঁদ দ্বিখণ্ডিত করে দেখালেও তারা বলবে যে সেটা যাদু ছিল… হেন ছিল, তেন ছিল – কিন্তু বিশ্বাস স্থাপন করবে না। শেষমেশ বিশ্বাস ওই ‘না দেখা বিষয়েই’ গিয়ে পড়বে। আর তাই তুমি বিশ্বাস করবে কি করবে না সেটা তোমার নিয়্যাতের উপরই নির্ভরশীল হবে।

তুমি যদি বিশ্বাস করতে চাও তবে সমস্ত প্রশ্নের উত্তর না জেনেই করতে হবে, আর বিশ্বাস করতে না চাইলে সমস্ত প্রশ্নের উত্তর জেনেও তুমি বিশ্বাস করবে না। তুমি প্রয়োজনে প্রমাণের অযোগ্য ‘মাল্টিভার্স’ থিউরিতে বিশ্বাস করবে, বিশ্বাস করবে কিছু গোঁড়ামিপূর্ণ মানুষ… মানুষের দেওয়া থিউরিতে… শুধুমাত্র বিশ্বাস না করবার জন্য প্রয়োজনে তোমার পূর্ব পুরুষদেরও বানর বলে দাবি করবে… ভাবতেও হাস্যকরা লাগে, এতসব মানবরচিত থিউরির জোড়াতালি আর প্রশ্নের ছড়াছড়ি শুধুমাত্র আল্লাহকে অবিশ্বাস করবার জন্য! এই ধরনের থার্ডক্লাস মানুষেরা আবার জিজ্ঞাসা করে আল্লাহ কেন জাহান্নাম বানালেন!

কিন্তু হ্যাঁ, তার মানে এই না যে ওইসব ফালতু প্রশ্নের কোনো উত্তর নেই। অবশ্যই আছে আর সেগুলো আর কেউ না জানলেও আল্লাহ রব্বুল আলামীন ঠিকই জানেন!” চায়ের কাপে শেষ চুমুকটা দিয়ে রেখে দিলাম। আমার কন্ঠ আরও জোরালো হল।

বলতে থাকলাম, “আমাদেরকে সমস্ত প্রশ্নের উত্তর জানানো হয় নাই। কারণ আমাদের সেগুলোর প্রয়োজন নাই। ‘আল্লাহ কেন মহাবিশ্ব সৃষ্টি করলেন, কীই বা হতো কিছু না সৃষ্টি করলে? এমনই একটি প্রশ্নের উত্তর আল্লাহ ফেরেশতাদেরই বলেছিলেন ‘আমি যা জানি, তোমরা তা জান না’। সুতরাং আমরা জানি না তো কী হয়েছে,

আল্লাহ সুবহানাহু হলেন ‘আল-আলীম’ অর্থাৎ সর্বজ্ঞ The All Knowing, তাঁর জ্ঞানের উপর কোনো জ্ঞান বা প্রশ্ন নেই। তোমাদের প্রশ্ন তো কিছুই না।

আর তুমি যেমন বললে না! ক্ষীণ সম্ভাবনা রয়েছে প্রশ্নগুলোর উত্তর পাবার। তার মানে তোমার মনে এই ধারণাও আসা স্বাভাবিক যে ক্ষীণ সম্ভাবনা রয়েছে সৃষ্টিকর্তা থাকবার। তুমি আর তোমার মত সমস্ত নাস্তিকেরাই তাদের বিশ্বাস নিয়ে দোদুল্যমান। আর সেটাই স্বাভাবিক। কারণ আল্লাহ মানুষের ভেতর তাঁকে বিশ্বাসের বিষয়টি ফিতরাতগতভাবে দিয়ে দেন, আর তা অবিকল থাকে যতক্ষণ না মানুষ দুনিয়ার বস্তাপচা তত্ত্ব খেয়ে খেয়ে সেই ফিতরাত নষ্ট করে ফেলে।

আমার কিন্তু কোনোই সন্দেহ নেই যে আল্লাহ রয়েছেন এবং একজনই রয়েছেন। এটি সবচেয়ে বড় সত্য। আর বিশ্বাস কর, তোমার আর তোমার মত নাস্তিকদের সমস্ত প্রশ্নের জবাব আল্লাহ দিয়ে দিতে পারবেন। কিন্তু কিয়ামতের দিনের আগে সেসবের জবাব তোমাদের পাওয়া হবে না। সেদিন তোমাদের কিছুই করার থাকবে না! ভয়ঙ্কর-মজার ব্যাপার কী জান? সেদিন তোমাদের সাথে অবিচারও করা হবে না। এ অবস্থায় মারা গেলে তোমরা সেদিন কী বলে কান্নাকাটি করবে জান? বলবে,‘আমরা নিজেদের সাথে জুলুম করেছি। ইয়া আল্লাহ, আপনি আমাদের আরেকটি সুযোগ দিন’ কিন্তু কেউ সেদিন একথা বলবে না যে ‘আমার প্রশ্নগুলোর উত্তর পাই নি’ বা ‘আমার উপর জুলুম করা হয়েছে’।

না না, আসলে তাও না। আল্লাহ হচ্ছেন আমাদের রব! তিনি তো বাধ্য নন তাঁরই এক নগন্য সৃষ্টির প্রশ্নের উত্তর দিতে! আল্লাহকে অবিশ্বাস করে কোনো বড় কিছু হয়ে যায় নি কেউ যে আল্লাহ তাকে উত্তর দিতে বাধ্য। বরং আমরা তাঁর বান্দা! আমরাই না আল্লাহর কাছে বাধ্য! আল্লাহু আকবার! তাই আমার তো মনে হয়, নাস্তিকদেরকে কোনো প্রশ্নের উত্তর না দিয়েই জাহান্নামে ফেলে দেওয়াও হতে পারে। আল্লাহ সর্বশ্রেষ্ঠ বিচারক। তবে হ্যাঁ, আল্লাহ যদি তোমাদের প্রশ্নের উত্তর না ই দেন, তখন কী করবে?”

এতক্ষণে দেখলাম ছেলেটার চোখমুখ ফ্যাকাশে হয়ে এসেছে। কিন্তু আমি থামলাম না।

“তখন তোমরা এটা জানবে যে একজন সৃষ্টিকর্তা আছেন, তিনি আল্লাহ। কিন্তু বান্দা হয়ে তোমার সৃষ্টিকর্তার সাথে দেখা তো দূরের কথা, কথাও বলতে পারবে না। এই মানসিক শাস্তিই তো তোমাদের জ্বালিয়ে পুড়িয়ে মারবে। তুমি কি ভেবেছিলে জাহান্নামের আগুনের উত্তাপই সেখানকার সর্বোচ্চ শাস্তি! আর তুমি তোমার প্রশ্নগুলোর উত্তর পেয়ে সেখানে দিব্যি মানসিক শান্তিতে থাকবে! মোটেও না। জাহান্নামকে গড়া হয়েছে শারীরিক মানসিক সবদিক থেকে কষ্ট দেওয়ার জন্য।

তোমার প্রশ্নের উত্তর দিয়ে তোমাকে জাহান্নামে পাঠানো হবে নাকি না দিয়েই পাঠানো হবে সে বিচার আল্লাহ করবেন। কিন্তু একথাও আমরা জানি যে আল্লাহ রব্বুল আ’লামীন তাঁর জান্নাতি বান্দাদের সাথে সরাসরি দেখা করবেন ও কথা বলবেন। আর এটাই হল জান্নাতিদের সবচেয়ে বড় পাওয়া – তাঁদের রবের সাথে সাক্ষাত, যিনি আমাদেরকে সৃষ্টি করেছেন, যাঁকে বান্দারা না দেখেই, কোনো অকাট্য প্রমাণ ব্যতিরেকেই, প্রশ্নগুলোর উত্তর না পেয়েই বিশ্বাস করেছিল। অথবা হয়ত সে সৃষ্টির মধ্যেই যথেষ্ট প্রমাণ মেনে নিয়েছিল বা প্রশ্নগুলোর জানা উত্তরেই সন্তুষ্ট ছিল – কারণ সে মূলত বিশ্বাস করতে চেয়েছিল।

আমি ভাবলেও শিওরে উঠি যখন নাস্তিকেরা জানবে যে একজন সৃষ্টিকর্তা আছেন, তাদের বিচারও হল। দুনিয়ায় থাকাকালীন ওই ‘না দেখে বিশ্বাস করা’ মানুষগুলো জান্নাতে গিয়ে আল্লাহকে দেখতে পাচ্ছে অথচ তখন এত ঠাঁটবাট নিয়ে চলা নাস্তিকগুলো এত বিদ্যে আওড়ানোর পরও তাঁদের রবকেই দেখতে পাবে না। একটুখানি বিজ্ঞানের গোঁড়ামিতে একটুখানি বিশ্বাসই আর করা হল না! অথচ বিজ্ঞানের জ্ঞানও আল্লাহর রহমতেই আমাদের পক্ষে জানা সম্ভব হয়েছিল! আফসোস এদের জন্য!”

আমার কণ্ঠ জোরালো হয়ে যাওয়ায় আশেপাশের অনেকেরই অনাকাঙ্ক্ষিত মনোযোগ আকর্ষণ করে ফেলেছি। আরমানের চাচতো ভাই বিস্ফোরিত চোখে তাকিয়ে আছে। আরমানও ব্যতিক্রম নয়। যদ্দুর মনে পড়ে, এমন কড়াভাবে ও আগে কখনও আমাকে কথা বলতে দেখে নাই হয়তো।

আমি এবার একটু শান্ত হয়ে বললাম, “দেখো, তোমার যদি সত্যিই এমন কোনো প্রশ্ন থাকে যেগুলোর উত্তর তুমি সত্যিই জানতে চাও তাহলে তুমি জান্নাতে গিয়ে আল্লাহ সুবহানাহুতা’লাকে সরাসরি জিজ্ঞেস করলেই পার! সুতরাং তোমারও ওই একটাই পথঃ সিরতল মুস্তাকিম!

তুমি বলছো তোমার প্রশ্নগুলোর অকাট্য উত্তর কেউ দিতে পারলে তুমি আস্তিক হয়ে যেতে! হাস্যকর। তুমি আস্তিক হও বা না হও তাতে কেবল একজন ছাড়া কারও কোনো লাভক্ষতি নেই, কারও কিছু আসে যায় না। সে একমাত্র মানুষটি হচ্ছ তুমি নিজে। জান্নাত নয়তো জাহান্নাম… পছন্দ তোমার।

এটাই তোমার সমস্ত প্রশ্নের সোজাসাপ্টা উত্তরঃ কোনো প্রমাণ নেই। আর প্রমাণ নেই বলেই আমরা মু’মিন অর্থাৎ বিশ্বাসী। অকাট্য প্রমাণ বা সোজা কথায় আল্লাহকে দেখলে পরে তো যে কেউই বিশ্বাস করতো। না দেখে বা অকাট্য প্রমাণ ছাড়া বিশ্বাস করাটাই হলপরীক্ষা।

তাই তুমি যে যুক্তিই খোঁজো না কেন কোন সময়েই তা তোমার কাছে বিতর্কের ঊর্ধে যাবে না… যতক্ষণ না তুমি আসলে প্রমাণ ছাড়াই বিশ্বাস করতে চাও। তাই বলছি তোমার নিয়্যাত ঠিক করে নাও। সমস্ত উত্তর পেয়ে যাবে। ”

বলে উঠে পড়লাম।

আসার আগে বলে আসলাম, “মানুষকে মাঝে মাঝে একা চিন্তা করবার জন্য সময় দিতে হয়। তুমি চালাক হলে বুঝতে পারবে যে এই সময়টাতে শয়তান তোমাকে ধোঁকা দেওয়ার চেষ্টা করবে। আল্লাহর কাছে আশ্রয় চেয়ে নিও।”

ওখানে আমি আর তখন দাঁড়াই নি। সালাম দিয়ে চলে এসেছি। শেষবার শুধু দেখলাম বিস্ফোরিত চোখে তাকিয়ে আছে ছেলেটি। আরমানের দিকে খেয়াল করি নি।

আমি ছেলেটিকে তেমন কথাই বলতে দিই নাই। কারণ আমি চেয়েছি ও যেদিন বলবে সেদিন যেন বাকিরা শোনে। কিন্তু তার জন্য আগে শোনানোর প্রয়োজন ছিল। যাই হোক, সেদিন রাতে আরমানের সাথে মসজিদে দেখা হলে ও বলল ওর কাজিন নাকি এরপর তেমন একটা কথাই বলে নাই। মাগরিবের আগেই নাকি চলে গিয়েছিল।

“সুবহানাল্লাহ! ভাল লক্ষণ… ওর জন্য আমাদের দুয়া করা উচিত। এক কাজ করিস, আমার পুরনো ডায়েরিটা ওর সাথে দেখা হলে ওকে দিয়ে দিস। ওহ হো! তোর কাজিনের নামটাই তো জিজ্ঞাসা করা হয় নাই!”

ভারতীয় গোয়েন্দা কর্মকর্তার ইসলাম গ্রহণ : এক নাটকীয় কাহিনী

https://i2.wp.com/www.waytojannah.com/wp-content/uploads/2016/02/tawheed.jpg

[ভারতীয় গোয়েন্দা কর্মকর্তা ড. মুহাম্মাদ হুযায়ফা (রাজকুমার) ছিলেন এক কট্টোরপন্থী হিন্দু। তার পরিবার শিক্ষিত হওয়ায় মুসলমানদের বিরুদ্ধাচরণে ছিল সিদ্ধহস্ত। কোন এক হিন্দু পরিবারের ইসলাম গ্রহণকে কেন্দ্র করে সংঘটিত ঘটনার পরিপেক্ষিতে তার ইসলাম গ্রহণ। ভারতের ফুলাতের জনৈক এক আলেমের দাওয়াতের মাধ্যমে তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন। পরবর্তীতে তার স্ত্রীও ইসলামকে আলিঙ্গন করেন। নিঃসন্তান রাজকুমার ইসলাম গ্রহণের পর আল্লাহর নিকট প্রার্থনা করে এক পুত্র সন্তান ও কন্যা সন্তান লাভ করেন। শুধুমাত্র ইসলাম গ্রহণের কারণে তিনি চাকুরী থেকে বরখাস্ত হন। যদিও পরবর্তীতে পুনরায় চাকুরীতে যোগদান করেন। ভারতের মুযাফফরনগর থেকে প্রকাশিত মাসিক উর্দূ পত্রিকা ‘আরমুগান’ ২০০৬ সালের অক্টোবর মাসে প্রকাশিত হয়। তার সাক্ষাৎকার গুরুত্বপূর্ণ মনে করে মূল সাক্ষাৎকার থেকে কিছু সংক্ষেপ করে উপস্থাপন করা হল। সহকারী সম্পাদক]

আহমাদ আওয়াহ : আস-সালাম ‘আলাইকুম ওয়া রহমাতুল্লা-হি ওয়া বারাকা-তুহ।

ডক্টর মুহাম্মাদ হুযায়ফা : ওয়া ‘আলাইকুমুস সালামু ওয়া রহমাতুল্লা-হি ওয়া বারাকা-তুহ।

আহমাদ আওয়াহ : আল্লাহর হাযার শুকরিয়া যে, আপনি এসেছেন। আপনার সম্পর্কে অনেক কথা শুনেছি। আপনার ইসলাম গ্রহণের খবর শুনে আপনার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে আমি খুবই উদগ্রীব ছিলাম। আল্লাহ সে সাক্ষাৎ করিয়ে দিলেন।

ডক্টর মুহাম্মাদ হুযায়ফা : দিল্লীতে এক সরকারী কাজে এসেছিলাম। মাওলানা ছাহেবের ফোন তো পাই না। ধারণা করলাম, ফোন করে দেখি। যদি ফুলাতে (ভারতের একটি স্থানের নাম) থাকেন, তাহলে দেখা করে যাব। বহুদিন যাবৎ দেখা সাক্ষাৎ না হওয়ার দরুণ খুবই অস্থির ছিলাম। ফোন করে জানতে পারলাম, তিনি দিল্লীতেই আছেন। আমার জন্য এর চেয়ে খুশির বিষয় আর কী হতে পারে যে, দিল্লীতেই তার সাথে দেখা হয়ে গেল। আমার আল্লাহর পরম অনুগ্রহ যে, রামাযানের আগেই দেখা হয়ে গেল। কেননা (মানসিক) অস্থিরতাও দূর হয়ে গেল, আবার ঈমানের ব্যাটারীও চার্জ হয়ে গেল। সাথে সাথে একটি প্রোগ্রামেও মাওলানা ছাহেবের সঙ্গে অংশগ্রহণ করার সুযোগ হ’ল। অনেক সান্ত্বনাও পেলাম। আল-হামদুলিল্লাহ।

আহমাদ আওয়াহ : হুযায়ফা ছাহেব! আমি একটা উদ্দেশ্য নিয়ে আপনার সঙ্গে দেখা করতে চাচ্ছিলাম। আমাদের এই ফুলাত থেকে ‘আরমুগান’ নামে একটি মাসিক ম্যাগাজিন বের হয়। আপনি সম্ভবত জানেনও। এ জন্য আপনার একটি সাক্ষাৎকার নিতে চাই, যাতে করে যারা দাওয়াতী কাজ করেন তারা এ থেকে অনেক দিক-নির্দেশনা পান। বিশেষ করে আপনার সাক্ষাৎকারের দ্বারা ভয়-ভীতি হরাস পায় ও উৎসাহ অনুপ্রেরণা বাড়ে।

ডক্টর মুহাম্মাদ হুযায়ফা : হ্যাঁ, আহমাদ ভাইয়া! আমি ‘আরমুগান’ সম্পর্কে বেশ জানি। আমি মাওলানা ছাহেবকে কয়েকবার আবেদন জানিয়েছি যে, তিনি যেন উক্ত পত্রিকার হিন্দী সংস্করণ বের করেন। তাহলে প্রতিবছরে কমপক্ষে পাঁচশ’ গ্রাহক বানাব ইনশাআল্লাহ! আমি জানলাম যে, সেপ্টেম্বর থেকে হিন্দী সংস্করণ বের হচ্ছে। কিন্তু জানি না কেন সেপ্টেম্বরে তা আর প্রকাশিত হল না।

আহমাদ আওয়াহ : ইনশাআল্লাহ অতি সত্বর তা আসছে। আপনি চিন্তা করবেন না। আববুরা এজন্য খুবই চিন্তিত। অথচ পত্রিকার জন্য লোকের দাবী ও চাহিদা খুব বেশী।

ডক্টর মুহাম্মাদ হুযায়ফা : আল্লাহ করুন। খবরটা যেন সত্য হয়। আহমাদ ভাই, এখন আদেশ করুন আমার কাছ থেকে কী জানতে চান?

আহমাদ আওয়াহ : আপনার পরিচয় দিন?

ডক্টর মুহাম্মাদ হুযায়ফা : ১৯৫৭ সালের ১৩ই আগস্ট তারিখে পূর্ব ইউপির বস্তি যেলার একটি গ্রামে জমিদারগৃহে আমার জন্ম। ১৯৭৭ সালে ইন্টারমিডিয়েট পাস করি। আমার চাচা ইউপি পুলিশে ডি.এস.পি. ছিলেন। তার ইচ্ছায় পুলিশে ভর্তি হই। চাকুরীরত অবস্থায় ১৯৮২ সালে বি.কম পাস করি এবং ১৯৮৪ সালে এম.এ করি। ইউপির ৫৫টি থানার ইন্সপেক্টর-ইন-চার্জ থাকি। ১৯৯০ সালে আমার প্রমোশন হয় ও সিও হই। ১৯৯৭ সালে একটি ট্রেনিংয়ের জন্য ফ্লোরা একাডেমীতে যেতে হয়। একাডেমির ডাইরেক্টর জনাব এ. এ. ছিদ্দিকী ছিলেন আমার চাচার বন্ধু। তিনি আমাকে ক্রিমিন্যালোজিতে পি.এইচ.ডি. করার পরামর্শ দেন। আমি ছুটি নিয়ে ২০০০ সালে পি.এইচ.ডি. করি। ১৯৯৭ সালে চাকুরীতে সর্বোত্তম দক্ষতা ও কৃতকার্যতার (best performance) ভিত্তিতে আমাকে বিশেষ পদোন্নতি হিসাবে ডি.এস.পি পদে প্রমোশন প্রদান করা হয় এবং মুযাফফরনগর যেলার পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগে পোস্টিং দেওয়া হয়। আমার কনিষ্ঠ ভ্রাতা ইঞ্জিনিয়ার। এক বোন আছে, যার বিয়ে হয়েছে এক কলেজ প্রভাষকের সঙ্গে। পরিবারে লেখাপড়া শেখার  রেওয়াজ আছে। বর্তমানে আমি পূর্ব ইউপির এক যেলা হেড কোয়ার্টারের গোয়েন্দা পুলিশের প্রধান।

আহমাদ আওয়াহ : আপনার ইসলাম গ্রহণ সম্পর্কে আমাদেরকে কিছু বলুন?

ডক্টর মুহাম্মাদ হুযায়ফা : আমার পরিবার শিক্ষিত। এ কারণে মুসলমানদের প্রতি শত্রুতায় তারা বিখ্যাত। এর একটি কারণ এটাও যে, আমাদের পরিবারের একটি শাখা আনুমানিক একশত বছর আগে ইসলাম কবুল করে ফতেহপুর, হাঁসওয়াহ ও প্রতাপগড়ে গিয়ে বসতি স্থাপন করে। তারা ছিল অত্যন্ত পাকা মুসলমান। এদিকে আমাদের বস্তিতে ত্রিশ বছর আগে বস্তির জমিদারদের ছোঁয়াছুঁয়ির জ্বালায় অতিষ্ট হয়ে আটটি দলিত (অস্পৃশ্য), অচ্ছুত, নিবুণ্রের হিন্দু পরিবার মুসলমান হয়ে যায়। এই দু’টি ঘটনায় আমার পরিবারে মুসলমানদের প্রতি শত্রুতার মনোভাব আরও বৃদ্ধি পায়। আমাদের খান্দানের কিছু যুবক গ্রামে ‘বজরং দল’-এর একটি শাখা কায়েম করে। পরিবারের যুবকরাই ছিল এর অধিকাংশ সদস্য। আমি এসব কথা এজন্য বললাম যে, কোন মানুষের ইসলাম গ্রহণের জন্য সবচেয়ে বিরোধী পরিবেশ ছিল আমার। কিন্তু আল্লাহ যাঁর নাম হাদী (হেদায়াতকারী) ও রহীম (পরম দয়ালু), তিনি আপন শানের কারিশমা দেখাতে চাচ্ছিলেন। তিনি আমাকে এক অদ্ভুত ও আশ্চর্যজনক পথ প্রদর্শন করেন।

আসলে হয়েছিল কি, গাযিয়াবাদ যেলার পাল খোয়ার্হ একই পরিবারের নয়জন লোক মাওলানার কাছে এসে ফুলাতে মুসলমান হয়। এদের মধ্যে ছিল মা-বাবা, চার মেয়ে ও তিন ছেলে। ছেলে ছিল বিবাহিত। মাওলানা ছাহেব তাদের কালেমা পড়তে বলেন। তারা বলে, আমরা আটজন তো এখন কালেমা পড়ছি। বড় ছেলেটি বিবাহিত। তার স্ত্রী এখনও মুসলমান হতে রাযী নয়। সে রাযী হলেই আমাদের এ ছেলেও একত্রে কলেমা পড়বে। মাওলানা ছাহেব বললেন, জীবন-মরণের আদৌ কোন ভরসা নেই। এও এক সাথেই কালেমা পড়ে নিক। এখনই তা স্ত্রীকে বলার দরকার নেই। এরপর স্ত্রীকে ইসলাম গ্রহণের জন্য প্রস্ত্তত করুক। তারপর আবার স্ত্রীর সঙ্গে একত্রে দ্বিতীয়বারের মত কালেমা পড়বে। মাওলানা ছাহেব তাদের সকলকে কালেমা পড়ান এবং তাদের অনুরোধে সকলের ইসলামী নামও রেখে দেন। তাদের একান্ত অনুরোধে একটি প্যাডে তাদের ইসলাম গ্রহণ এবং নতুন নামের সার্টিফিকেট বানিয়ে দেন। তাদের এটাও বলে দেন যে, আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ যরূরী। এ জন্য শপথনামা তৈরি করে ডিএমকে রেজিস্ট্রি ডাকযোগে পাঠিয়ে দেবে এবং কোন পত্রিকায় ঘোষণা প্রদান যথেষ্ট হবে। এরা খুশি হয়ে সেখান থেকে চলে যায় এবং আইনগত পাকা কার্যক্রম গ্রহণ করে। বাচ্চাদেরকে মাদরাসায় ভর্তি করিয়ে দেয়।

অতঃপর বড় ছেলের বৌ বিষয়টি অবগত হওয়ার পর পরিবারের অন্যান্য লোকদের বলে দেয়। এক দু’জন করে সর্বত্র এ খবর ছড়িয়ে পড়ে। ফলে এলাকার পরিবেশ উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। হিন্দু সংগঠনগুলো উত্তেজিত হয়ে উঠে। টিভি চ্যানেলের লোকেরা এসে যায়। ফলে দেখতে না দেখতেই দাবানলের মত চতুর্দিকে এ খবর ছড়িয়ে পড়ে। ‘দৈনিক জাগরণ’ ও ‘অমর উজালা’ এ দুই হিন্দী পত্রিকায় চার কলামব্যাপী বড় বড় হরফে এই খবর ছাপা হয়। যার হেডলাইন ছিল, ‘লোভ দেখিয়ে ধর্মান্তকরণে সমগ্র হিন্দু সম্প্রদায়ের মধ্যে ক্ষোভ : ধর্মান্তকরণ ফুলাত মাদরাসায় হয়েছে’ এই খবরে গোটা এলাকায় তীব্র উত্তেজনা ও উত্তাপ সৃষ্টি হয়। সে সময় আমার পোস্টিং ছিল মুযাফফরনগর। অফিসিয়াল দায়িত্ব ছাড়াও এ খবরে আমার নিজের মধ্যেও ক্রোধের সঞ্চার হয়। আমি আমার দু’জন ইন্সপেক্টরসহ ফুলাত পৌঁছি। সেখানে যেসব লোকের সঙ্গে দেখা হয়, তাঁরা অজ্ঞতা প্রকাশ করে এবং বলে যে, মাওলানা ছাহেবই কেবল সঠিক বিষয় বলতে পারেন। তারা আমাদেরকে আশ্বস্ত করেন যে, আমাদের এখানে কোন বেআইনী কাজ হয় না। মাওলানা ছাহেবের সঙ্গে আপনারা দেখা করুন। তিনি আপনাদেরকে যা সত্য তাই বলবেন। আমি তাদেরকে আমার ফোন নম্বর দিই, যেন মাওলানা ছাহেবের ফুলাত আগমনের খবর আমাকে জানাতে পারে।

তৃতীয় দিন ফুলাতে মাওলানা ছাহেবের প্রোগ্রাম ছিল। ২০০২ সালের ৬ই নভেম্বর বেলা এগারটায় আমরা ফুলাত পৌঁছি। তার সঙ্গে দেখা হয়। তিনি খুব আনন্দের সাথে আমাদের সঙ্গে মিলিত হন। আমাদের জন্য চা-নাশতার ব্যবস্থা করেন। তিনি বলেন, খুব খুশি হয়েছি যে, আপনারা এসেছেন। আসলে মৌলভী-মোল্লাদের ও মাদরাসাগুলো নিয়ে বিভিন্ন ধরনের অপপ্রচার করা হয়ে থাকে। আমি তো আমার সাথীদের ও মাদরাসাওয়ালাদের বারবার বলি, পুলিশের লোক, হিন্দু সংগঠনের দায়িত্বশীল ব্যক্তিবর্গ, সি.আই.ডি., সিবিআই-এর লোকদের খুব বেশি বেশি মাদরাসাগুলোতে ডেকে আনা দরকার; বরং কয়েক দিন মেহমান হিসাবে রাখা উচিত, যাতে করে তারা মুসলমানদের  ভেতরকার অবস্থা সম্পর্কে অবহিত হতে পারেন এবং মাদরাসাগুলোর কদর বুঝতে পারেন। আমি বললাম, আপনি একদিন আগেও এসেছিলেন। আপনার জন্যই আজ এসেছি। মাওলানা ছাহেব হেসে বললেন, বলুন আপনার কী সেবা করতে পারি?

আহমাদ ভাই! মাওলানা ছাহেব সাক্ষাতের প্রারম্ভেই এমন আস্থা ও ভালবাসার প্রকাশ ঘটালেন যে, আমার চিন্তা-ভাবনার ধারাই পাল্টে গেল। আমার ভেতর ক্রোধের আধা ভাগও অবশিষ্ট ছিল না। আমি পত্রিকা বের করলাম এবং জানতে চাইলাম, এ খবর পড়েছেন কি?

মাওলানা ছাহেব বললেন, ‘রাত্রে আমাকে এ পত্রিকা দেখানো হয়েছে। আমি ‘অমর উজালা’-তে এই খবর পড়েছি’। আমি বললাম, ‘এরপর এ ব্যাপারে আপনি কী বলেন?’

মাওলানা ছাহেব বললেন যে, ‘আমি এক সফরে যাচ্ছিলাম। তো যখন গাড়িতে আরোহণ করতে যাচ্ছি এমন সময় একটি জীপ গাড়ি এসে দাঁড়াল। আমার সফরের তাড়া ছিল। তাদের মধ্যে একজন বলল, এরা আমাদের ভাই। তারা তাদের বাড়ির লোকজনসহ মুসলমান হতে চায়। এজন্য তারা এক মাস যাবৎ পেরেশান। আমি গাড়ি থেকে নেমে আসি, তাদের কালেমা পড়াই। তাদের চাপাচাপিতে আমি তাদের ইসলামী নামও বলে দিই এবং তাদের সবাইকে ইসলাম গ্রহণের একটি সার্টিফিকেটও দিই। তাদের এটাও বলে দিই যে, আইনগত কার্যক্রম সম্পন্ন হলে আপনারা শপথনামা/হলফনামা তৈরি করে ডি.এম-কে জানাবেন। একটি পত্রিকায় ঘোষণা পাঠাবেন। তবে আরও ভাল হয় যদি যেলা গেজেটে দিয়ে দেন। তারা ওয়াদা করল যে, কালই গিয়ে আমরা এসব কাজ করব।

আমি জানতে পেরেছি, তারা তা সম্পন্ন করেছে। মাওলানা ছাহেব বললেন, আমাদের দেশ সেক্যুলার রাষ্ট্র এবং রাষ্ট্রের আইন-কানূন আপন ধর্ম মানা ও ধর্মের দাওয়াত প্রদানের মৌলিক অধিকার আমাদেরকে দিয়েছে। কাউকে ঈমানের দাওয়াত দেয়া, কেউ মুসলমান হতে চাইলে তাকে কালেমা পড়ানো আমাদের মৌলিক আইনগত ও সাংবিধানিক অধিকার। যে অধিকার আইন ও সংবিধান আমাদেরকে দেয়, সে ব্যাপারে আমরা কাউকে ভয় পাই না। আমরা জেনে-বুঝে কোন বেআইনী কাজ কখনো করি না। ভুলক্রমে হয়ে গেলে তার সংশোধন ও ক্ষতিপূরণ করার চেষ্টা করি। লোভ দেখিয়ে কিংবা ভীতি প্রদর্শনপূর্বক ধর্ম পরিবর্তনের কথা বলছেন? এটা তো একদম বেআইনী। আমার ব্যক্তিগত ধারণা হল এই যে, এই বেআইনী কাজ সম্ভবও নয়। ধর্ম পরিবর্তন করা অথবা কারোর মুসলমান হওয়া তার অন্তর-মনের বিশ্বাসের পরিবর্তনের ব্যাপার, যা লোভ-লালসা বা ভয়-ভীতির দ্বারা হতেই পারে না। আপনাকে খুশী করার জন্য কেউ বলতে পারে যে, আমি হিন্দু হচ্ছি অথবা মুসলমান হচ্ছি। কিন্তু এত বড় সিদ্ধান্ত নিজের জীবনে মানুষ ভেতরের অনুমোদন ছাড়া কখনো নিতে পারে না।

দ্বিতীয়ত: এর চাইতেও যা গুরুত্বপূর্ণ ও যরূরী তা হল, আমি একজন মুসলমান। আর মুসলমান তাকে বলা হয়, যে সকল সত্য কথাকে মানে। আমাদের মালিক এবং তাঁর প্রেরিত রাসূল মুহাম্মাদ (ছাঃ) যাঁর সম্পর্কে এই ভুল ধারণা বিদ্যমান যে, তিনি কেবল মুসলমানদের রাসূল এবং তাদের (মুসলমানদের) জন্য মালিকের পক্ষ থেকে সংবাদবাহক ছিলেন। অথচ কুরআন ও হাদীছে রাসূল (ছাঃ) সম্পর্কে কেবল একথাই পাওয়া যায় যে, তিনি বলেন, আমি সকলের মালিক প্রভুর পক্ষ থেকে প্রেরিত সমগ্র মানব জাতির প্রতি সর্বশেষ রাসূল। তিনি এত সত্যবাদী ছিলেন যে, তাঁর দ্বীনের ও জীবনের শ্রেষ্ঠ দুশমনও তাঁকে কখনো মিথ্যাবাদী বলতে পারেনি। বরং তাঁর শত্রুরাও তাঁকে আছ-ছা-দিকুল আমীন (বিশ্বস্ত আমানতদার) এবং সত্যবাদী ও ঈমানদার উপাধি দিয়েছে। আমাদের বিশ্বাস এই যে, দিন হচ্ছে, আমাদের চোখ তা দেখছে। অথচ এই চোখ ধোঁকা দিতে পারে যে, দিন হচ্ছে। কিন্তু রাসূল (ছাঃ) আমাদের যে খবর দিয়েছেন, তার মধ্যে বিন্দুমাত্র ভুল, ধোঁকা ও মিথ্যার লেশমাত্র নেই। আমাদের রাসূল (ছাঃ) জানিয়েছেন, ‘মানুষ পরস্পর রক্ত সম্পর্কীয় ভাই (আদম (আঃ)-এর দিক দিয়ে)। সম্ভবত আপনারাও তা বিশ্বাস করেন’। আমি বললাম যে, ‘আমাদের এখানেও তাই মনে করা হয়’।

মাওলানা বললেন, ‘একথা তো একদম সত্য যে, আমরা এবং আপনারা, আমি এবং আপনি রক্ত সম্পর্কীয় ভাই। এর চেয়ে বেশী এটাও হতে পারে যে, আপনি আমার চাচা অথবা আমি আপনার চাচা। আমার ও আপনার মধ্যে রক্তের সম্পর্ক আছে। এই রক্ত সম্পর্ক ছাড়াও আপনিও মানুষ আর আমিও মানুষ। আর মানুষ তো সে-ই, যার মধ্যে প্রেম-ভালবাসা বিদ্যমান। একে অন্যের প্রতি কল্যাণের প্রেরণা বিদ্যমান। এই সম্পর্কের ভিত্তিতে আপনি যদি এটা মনে করেন যে, হিন্দু ধর্মই একমাত্র মুক্তির পথ ও মোক্ষ লাভের উপায়, তাহলে আপনাকে এই সম্পর্কের দিকে তাকিয়ে ও এই সম্পর্কের খাতিরে আমাকে হিন্দু বানাবার জন্য জানপ্রাণ দিয়ে চেষ্টা করা উচিত। আর আপনি যদি মানুষ হন, আপনার বুকের মধ্যে যদি পাথর না থেকে থাকে, মায়া-মমতাশূন্য না হন, তাহলে আপনার ভেতর ততক্ষণ পর্যন্ত স্বস্তি আসা উচিত নয়, যতক্ষণ পর্যন্ত না আমি ভুল পথ ছেড়ে মুক্তির পথে এসে যাই’। অতঃপর মাওলানা ছাহেব আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, কথা ঠিক কিনা? আমি বললাম, ‘বিলকুল ঠিক’।

মাওলানা ছাহেব বললেন, ‘আপনাকে সর্বপ্রথম এসেই আমাকে হিন্দু হবার জন্য বলা দরকার ছিল’।

দ্বিতীয় কথা হল, আমি মুসলমান। বহির্গত সূর্যের আলোকরশ্মির চেয়েও আমার এ কথার উপর বেশি বিশ্বাস যে, ইসলামই একমাত্র সর্বপ্রথম ও সর্বশেষ ধর্ম এবং মুক্তি লাভের একমাত্র পথ। আপনি যদি মুসলমান না হয়ে দুনিয়া থেকে চলে যান, তাহলে চিরস্থায়ীভাবে নরকে জ্বলতে হবে। জীবনের একটি নিঃশ্বাসেরও বিশ্বাস নেই। যেই শ্বাসটি ভেতরে চলে গেল এর কী নিশ্চয়তা আছে যে, তা বাইরে আসা পর্যন্ত আপনি বেঁচে থাকবেন? আর এরই বা ভরসা কোথায় যে, যেই নিঃশ্বাসটি বাইরে বেরিয়ে গেল, তা ভেতরে নিয়ে আসা পর্যন্ত আপনি বেঁচে থাকবেন? এমতাবস্থায় আমি যদি মানুষ হই আর আমি আপনাকে আমার রক্ত সম্পর্কীয় ভাই মনে করি, তবে যতক্ষণ আপনি কালেমা পড়ে মুসলমান না হবেন, ততক্ষণ আমার স্বস্তি আসবে না।

তিনি আরো বলেন, একথা আমি নাটক হিসাবে বলছি না। স্বল্পক্ষণের এই সাক্ষাতের পর রক্ত সম্পর্কের কারণে যদি রাত্রে শুতে শুতেও আপনার মৃত্যু ও নরকের আগুনের খেয়াল জাগে, তাহলে আমি অস্থির হয়ে কাঁদতে থাকব। এজন্য স্যার! আপনি পালখোহওয়ালদের চিন্তা বাদ দিন। যেই মালিক জন্ম দিয়েছেন, পয়দা করেছেন, জীবন দিয়েছেন তাঁর সামনে মুখ দেখাতে হবে। আমার ব্যাথার চিকিৎসা তো তখনই হবে, যখন আপনারা তিনজনই মুসলমান হয়ে যাবেন। এজন্য আপনাকে অনুরোধ করছি, আপনি আমার উপর দয়া করুন। আপনারা তিনজনই কালেমা পড়ুন।

আহমাদ ভাই! আমি তখন এক অপর বিস্ময়ের সাগরে নিমজ্জিত ছিলাম। মাওলানা ছাহেবের ভালবাসা তো নয়, তাব সবগুলো কথা ছিল যাদু! আমি এমন এক পরিবারের সদস্য যাদের ঘটিতে মুসলমান, মুসলিম রাজা-বাদশাহ ও ইসলামের প্রতি শত্রুতা পান করানো হয়েছিল। আমি এই খবর পড়ে সীমাতিরিক্ত উত্তেজিত ও বিক্ষুব্ধ হই এবং বিষয়টি তদন্ত করে দেখার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফুলাত গিয়েছিলাম। কিন্তু মাওলানা ছাহেব আমাকে না ইসলাম সম্পর্কে অধ্যয়নের জন্য বলছেন, আর না ভুল বোঝাবুঝি দূর করার জন্য বলছেন। ব্যস, সোজাসুজি মুসলমান হবার জন্য বলছেন। কিন্তু তখন আমার অন্তর ও বিবেক যেন মাওলানা ছাহেবের ভালবাসার নিগড়ে অসহায় রকম বন্দী। আমি বললাম, কথা তো আপনার একেবারে সাদামাটা ও সত্য এবং আমাদেরকে ভাবতেই হবে। কিন্তু এই সিদ্ধান্ত এত জলদী করার নয় যে, এত তাড়াতাড়ি আমি তা নিতে পারি। মাওলানা ছাহেব বললেন, সত্য কথা হল আপনি এবং আমি সবাই মালিকের সামনে এক বড় দিনের হিসাবের জন্য একত্রিত হব। সে সময় এই সত্য আপনি অবশ্যই পাবেন যে, এই ফায়ছালা খুব তাড়াতাড়ি করার এবং এতে বিলম্ব করার আদৌ অবকাশ নেই। মানুষ এ ব্যাপারে যত দেরী করবে, ততই পস্তাবে।

জানি না, এরপর জীবন-যিন্দেগী ফায়ছালা করার অবকাশ দেয় কি-না। মৃত্যুর পর পুনরায় আফসোস ও পস্তানো ছাড়া মানুষের আর কিছুই করার থাকবে না। করতে পারবে না। এ কথা অনড় সত্য যে, ঈমান গ্রহণ করা এবং মুসলমান হওয়ার চেয়ে বেশী তাড়াহুড়া করার মত আর কোন ফায়ছালা হতেই পারে না। তবে হ্যাঁ, আপনি যদি হিন্দু ধর্মকে মুক্তির পথ মনে করেন, তাহলে আমাকে হিন্দু বানাতে আপনাকে এতটাই জলদী করা দরকার, যেভাবে আমি মুসলমান হবার জন্য তাড়াতাড়ি করতে বলছি। আমার খেয়াল হল যে, যে বিশ্বাস, যে দৃঢ় আস্থা ও প্রত্যয়ের সঙ্গে মাওলানা ছাহেব আমাকে মুসলমান হতে বলছেন, সে বিশ্বাস ও আস্থার সাথে আমি তাঁকে হিন্দু হতে বলতে পারছি না। বরং সত্য বলতে কি, আমরা আমাদের গোটা ধর্মকে কোথাও শ্রুত প্রথার উপর কাহিনী সমষ্টি ছাড়া কিছুই মনে করি না। হিন্দু ধর্মের উপর আমার বিশ্বাসের অবস্থা যখন এই, তখন কাউকে কোন্ ভরসায় ও কিসের উপর ভর করে হিন্দু হওয়ার জন্য দাবি জানাতে পারি?

আমার ভেতর থেকে কেউ যেন বলছিল, রাজকুমার! ইসলামের মধ্যে অবশ্যই সত্য রয়েছে, মাওলানা ছাহেবের মধ্যে এই সত্যের বিশ্বাস রয়েছে। মাওলানা ছাহেব কখনো কখনো তোষামোদের সাথে আবার কখনো জোর দিয়ে বারবার আমাদেরকে কালেমা পড়ে মুসলমান হবার জন্য বলতে থাকেন। মাওলানা ছাহেব যখন তোষামোদ করতেন, তখন আমার মনে হত যেন কোন বিষপানে ইচ্ছুক ও আগ্রহী অথবা আগুনে লাফ দিয়ে পড়তে উদ্যত কাউকে ধ্বংসের হাত থেকে বাঁচাবার জন্য কোন সংবেদনশীল, কোন মমতাময়ী মা তার সন্তানকে তোষামোদ করছেন।

মাওলানা ছাহেব আমাদেরকে বারবার কালেমা পাঠের উপর জোর দিতে থাকেন। আমি ওয়াদা করি, আমরা বিষয়টা নিয়ে অবশ্যই চিন্তা-ভাবনা করব। আমাদের পড়ার জন্য কিছু বই দিন। আমরা গবেষণা করে দেখি। তখন তিনি আল্লাহর নিকট দো‘আ করতে বলেন, হে্ মালিক! তুমি আমাকে সঠিক পথ প্রদর্শন করুন। তুমিতো সর্বাধিক দয়ালু! চোখ বন্ধ করে যখন সেই মালিককে স্মরণ করবেন, তখন আপনাদের জন্য আল্লাহ ইসলামের পথ অবশ্যই খুলে দেবেন। মূলতঃ মানুষের দিলকে ও হৃদয়-মনকে পাল্টে দেবার ফায়ছালা সেই একক সত্তার কাজ। আমি মাওলানা ছাহেবকে বলি, ঠিক আছে। পরিবেশ গরম হচ্ছে, উত্তপ্ত হচ্ছে। আপনি পত্রিকার এই খবর খন্ডন করে একটি বিবৃতি দিন। মাওলানা ছাহেব বললেন, আমি তাদেরকে ধর্মীয় ও আইনগত অধিকার ভেবে কালেমা পড়িয়েছি। মিথ্যা খন্ডন কিভাবে হতে পারে? আমার অভিমত হল, আপনারও কোন মিথ্যা কথা গোপন করবেন না। আমি বললাম, আচ্ছা আমরা নিজেরাই করে দেব। এরপর আমরা ফিরে যাই।

আহমাদ আওয়াহ : আপনি কালেমা পড়েননি?

ডক্টর মুহাম্মাদ হুযায়ফা : মাওলানা ছাহেব কর্তৃক প্রদত্ত বইসমূহ অধ্যয়ন করে আমার ভেতর মাওলানা ছাহেবের সঙ্গে সাক্ষাতের আগ্রহ থেমে থেমে বৃদ্ধি পেতে থাকে। ইসলাম সম্পর্কে পড়ার আগ্রহ আরো বৃদ্ধি পায়। আমি মুযাফফরনগরে একটি দোকান থেকে কুরআন মাজীদের একটি হিন্দী অনূদিত কপি নিয়ে আসি। আমি ফোনে মাওলানা ছাহেবের কাছে এটি পড়ার আকাঙ্ক্ষা ব্যক্ত করি। তিনি বলেন, দেখুন কুরআন মজীদ আপনি অবশ্যই পড়বেন। কিন্তু হ্যাঁ, কেবল একথা মনে করে যে, আমার মালিকের প্রেরিত বাণী, এটি মালিকের কালাম, মালিকের কথা মনে করে খুব ভালভাবে আপনি পড়ুন। পবিত্র কালাম পাক-সাফ হয়েই পড়া উচিত। অতঃপর আমি দু’সপ্তাহে গোটা কুরআন মাজীদ পড়ে ফেলি। এখন আমার মুসলমান হওয়ার জন্য ভেতরের দরজা খুলে গিয়েছে। আমি ফুলাত গিয়ে মাওলানা ছাহেবের সামনে কালেমা পড়ি। মাওলানা ছাহেব আমার নাম ‘রাজকুমার’ বদলে আমার ইচ্ছানুক্রমে ‘মুহাম্মাদ হুযায়ফা’ রাখেন এবং বলেন যে, আমাদের নবী করীম (ছাঃ) এই নামের এক ছাহাবীকে গোপনীয়তা রক্ষা ও গোয়েন্দাগিরীর জন্য পাঠাতেন। এদিক দিয়ে এ নাম আমার খুব ভাল লাগে।

আহমাদ আওয়াহ : ইসলাম গ্রহণের পর চাকুরীতে আপনার কোন সমস্যা হয়নি?

ডক্টর মুহাম্মাদ হুযায়ফা : এলাহাবাদে পোস্টিং থাকাকালে আমি আমার ইসলাম গ্রহণের ঘোষণা দিই এবং আইনগত কার্যক্রম হাইকোর্টের একজন উকীলের মাধ্যমে গ্রহণ করি, যেজন্য আমাকে আমার বিভাগ থেকে অনুমতি গ্রহণ আবশ্যক ছিল। আমি এজন্য দরখাস্ত করি। একজন বেদজী ছিলেন আমার বস। তিনি কঠোরভাবে আমাকে এ থেকে বাধা দেন এবং আমি এ সিদ্ধান্ত নিলে তিনি আমাকে সাসপে- করবেন বলে হুমকিও দেন। আমি তাকে পরিষ্কারভাবে জানিয়ে দিই, এ সিদ্ধান্ত তো আমি নিয়ে ফেলেছি। এখন আর সেখান থেকে ফেরার কোন প্রশ্নই আসে না। আপনি যা করতে পারেন করুন। তিনি আমাকে সাসপেন্ড করেন। আমি আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করি। এসময়ে ইসলাম সম্পর্কে আরো জানার সুযোগ পেলাম। পরবর্তীতে লাক্ষ্ণৌয়ের একজন মুসলমান অফিসারের সহযোগিতায় এবং আল্লাহর বিশেষ অনুগ্রহে আমাকে চাকুরীতে পুনর্বহাল করা হয়।

আহমাদ আওয়াহ : আপনার সঙ্গী দুই ইন্সপেক্টরের কী হল, যারা আববুর সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলেন?

ডক্টর মুহাম্মাদ হুযায়ফা : তাদের একজন ইসলাম কবুল করেছেন। তার পরিবারের পক্ষ থেকে অনেক সমস্যা ও বিপদাপদ এসেছে। তার স্ত্রী তাকে ছেড়ে চলে গেছে। কিন্তু তিনি দৃঢ় ও স্থির আছেন আপন বিশ্বাসে। আল্লাহ তা‘আলা তার অবস্থার সমাধান করেছেন। দ্বিতীয়জন ভেতরে ভেতরে তৈরি। কিন্তু সাথীর অসুবিধা হওয়ার কারণে একটু ভীত।

আহমাদ আওয়াহ :  পরিবারের লোকদের ওপর কাজ করেননি?

ডক্টর মুহাম্মাদ হুযায়ফা : আল-হামদুলিল্লাহ, কাজ চলছে। ব্যাপক ও বিস্তারিতভাবে চলছে। তবে এলাহাবাদে পোস্টিংকালে আমি আমার স্ত্রীকে অনেক কিছু বলে দিই। সে ছিল খুব অনুগত, সহজ-সরল মহিলা। সে আমার সিদ্ধান্তের এতটুকু বিরোধিতা করেনি, বরং সকল অবস্থায় আমার সাথে থাকবে বলে প্রতিশ্রুতি দেয়। আমি তাকেও বই-পুস্তক পড়িয়েছি। আমাদের বিয়ে হয়েছে দশ বছর। কিন্তু কোন সন্তানাদি ছিল না। আমি তাকে লোভ দেখাই যে, ইসলাম কবুল করলে আমাদের মালিক আমাদের উপর খুশি হবেন এবং আমাদের সন্তানাদিও দেবেন। সন্তান না হবার কষ্টে সে খুবই বিষণ্ণ থাকত। এই কথায় সে খুব খুশি হয়। এক মাদরাসায় নিয়ে গিয়ে তাকে কালেমা পড়াই। আল্লাহর কাছে বহু দো‘আ করি, আমার রব! আপনার ভরসায় আমি তাকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছি। আপনি আমার ভরসার সম্মান রক্ষা করুন এবং একটা হলেও তাকে সন্তান দিন। আল্লাহর কি দয়া! এগার বছর পর আমাদেরকে তিনি ফুটফুটে পুত্রসন্তান দেন। এরপর তিন বছর যেতেই এক কন্যা সন্তান দান করেছেন। ফালিল্লা-হিল হাম্দ।

আহমাদ আওয়াহ : পাঠকদের উদ্দেশ্যে আপনি কোন পয়গাম বা নছীহত করবেন কি?

ডক্টর মুহাম্মাদ হুযায়ফা : ইসলাম ধর্ম থেকে বড় কোন সত্য নেই। আর এ এমন এক সত্য যে, একে যিনি মেনে চলবেন, তাকে এর উপর আমল করতে কাউকে ভয় পাবার দরকার নেই, কিংবা অন্যের কাছে পৌঁছতে বাধা সৃষ্টি করারও দরকার নেই। কম-বেশী বিরোধিতা আসবে। আমাদের মাওলানা ছাহেব বলেন, ‘ইসলাম এক আলো আর সমস্ত বাতিল ধর্ম অন্ধকার। অন্ধকার কখনো আলোর উপর জয়লাভ করতে পারে না। বরং আলোই জয়ী হয়। আলো যখন কখনো কখনো হরাস পায়, তখন মনে হয় অন্ধকার চতুর্দিকে ছেয়ে গেছে এবং সবকিছু ঢেকে ফেলেছে। কিন্তু আলো একটু উজ্জ্বল করে তুলে ধরুন, দেখবেন অন্ধকার দূরে পালিয়ে গেছে’। ব্যস, আমাকে এটা মানতে হবে। আর এটাই আমার পয়গাম বা নছীহত যে, বিজয় সবসময় আলোর মশালধারীদেরই হয়। এজন্য কোনরূপ ভয়-ভীতি ব্যতিরেকে ইসলামের দাওয়াত দেওয়া দরকার এবং কোন রকম লোভ-লালসা ছাড়াই সত্যিকারের পারস্পরিক ব্যথা-বেদনার হক আদায় করার নিয়তে দাওয়াত দিয়ে যাই। দেখবেন, আমার মত ইসলামের দুশমন ও মুসলমানদের প্রতি শত্রুতা পোষণকারী ব্যক্তি তদন্তের উদ্দেশ্য এসে যদি হেদায়াত পাই, তাহলে সহজ সরল মন-মস্তিষ্কের লোকগুলোর উপর এর প্রভাব পড়া তো আরও স্বাভাবিক।

আহমাদ আওয়াহ : শুকরিয়া, জাযাকাল্লাহ।

ডক্টর মুহাম্মাদ হুযায়ফা : আচ্ছা, এজাযত দিন। আস-সালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লা-হি ওয়া বারাকা-তুহ।

আহমাদ আওয়াহ : ওয়া ‘আলাইকুমুস সালাম ও রাহমাতুল্লা-হি ওয়া বারাকা-তুহ। অনেক অনেক শুকরিয়া।

ডক্টর মুহাম্মাদ হুযায়ফা : শুকরিয়া জাযাকুমুল্লাহু খায়রান।

[সাক্ষাৎকার গ্রহণে : আহমাদ আওয়াহ নদভী; মুযাফফরনগর, ভারত থেকে প্রকাশিত মাসিক ‘আরমুগান’-এর সৌজন্যে]

সূদ -এর কুফল

 

মানব জাতির ইতিহাস পর্যালোচনা করে ও বিভিন্ন আর্থ-সামাজিক গবেষণা হ’তে সূদের ছোট-বড় অন্ততঃ পঞ্চাশটি কুফলের সন্ধান পাওয়া গেছে। সেগুলোকে নৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক, আন্তর্জাতিক ইত্যাদি শ্রেণীতে ভাগ করা যায়। সেসবের পুনরুক্তি না ঘটিয়ে এবং অপেক্ষাকৃত কম গুরুত্বপূর্ণ কুফলের প্রসঙ্গে না গিয়ে গুরুত্বপূর্ণ কুফলগুলো সম্পর্কে এখানে সংক্ষেপে আলোচনা করা হ’ল।-

নৈতিক ও সামাজিক কুফল

১। সূদ সমাজ শোষণের সবচেয়ে শক্তিশালী মাধ্যম :

একদল লোক বিনাশ্রমে অন্যের উপার্জনে ভাগ বসায় সূদের সাহায্যেই। ঋণগ্রহীতা যে কারণে টাকা ঋণ নেয় সে কাজে তার লাভ হোক বা না হোক তাকে সূদের অর্থ দিতেই হবে। এর ফলে অনেক সময় ঋণ গ্রহীতাকে স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ বিক্রি করে হ’লেও সূদসহ আসল টাকা পরিশোধ করতে হয়। পরিণামে সে আরও দরিদ্র হয়। সমাজে শ্রেণীবৈষম্য আরও বৃদ্ধি পায়। বস্তুতঃ সূদ গ্রহীতারা সমাজের পরগাছা। এরা অন্যের উপার্জন ও সম্পদে ভাগ বসিয়ে জীবনযাপন করে। উপরন্তু বিনাশ্রমে অর্থ লাভের ফলে সমাজের প্রত্যক্ষ অর্থনৈতিক কর্মকান্ডে এদের কোন অবদান থাকে না।

২। সূদ মানুষকে স্বার্থপর ও কৃপণ বানায় :

অর্থলিপ্সা, কার্পণ্য ও স্বার্থপরতা সূদখোরদের কতিপয় চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য। বিনাশ্রমে উপার্জনের আকাঙ্খা ও অর্থলিপ্সা হ’তেই সূদ প্রথার জন্ম। সূদের মাধ্যমে নিশ্চিত ও নির্ধারিত আয় প্রাপ্তির লোভ সূদখোরদের বিচার-বিবেচনা, আবেগ-অনুভূতি এমনকি বিবেককে পর্যন্ত নিঃসাড় করে দেয়। সূদখোরদের মধ্যে লোভ ও স্বার্থপরতা ক্রমে ক্রমে এতদূর প্রসার লাভ করে, তাদের আচার-আচরণের এতখানি পরিবর্তন ঘটে যে, তারা হয়ে ওঠে সমাজের পরিহাসের পাত্র। তাদের প্রবাদতুল্য লোভ, পরের সম্পদ ও বিত্ত গ্রাসের প্রবণতা গল্প-কাহিনীর খোরাক হয়ে ওঠে। ইতিপূর্বে সেসব উদাহরণ তুলে ধরা হয়েছে। যারা সূদ দিতে সক্ষম তাদের জন্য মহাজন ও সূদী ব্যাংকগুলো এগিয়ে আসে ঋণের পসরা নিয়ে। কিন্তু যারা সূদ দিতে অপারগ তাদের পক্ষে ঋণ পাওয়া তো দূরের কথা, অনেক সময়ে মৌখিক সহানুভূতিটুকু পাওয়াও হয়ে ওঠে না।

৩। সূদ শ্রমবিমুখতা ও অলসতা সৃষ্টি করে :

সূদভিত্তিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় ব্যাংকে অর্থ জমা রাখলে কোন পরিশ্রম ও ঝুঁকি ছাড়াই সূদের মাধ্যমে নির্ধারিত হারে অর্থ পাওয়া যায়। এই ব্যবস্থা যোগ্যতাসম্পন্ন, প্রতিভাবান ও কর্মঠ লোককেও অকর্মণ্য ও অলস বানিয়ে দেয়। ব্যবসা-বাণিজ্য ও শিল্প-কারখানা স্থাপন অর্থাৎ উৎপাদনধর্মী কাজে যে চিন্তা-ভাবনা, পরিকল্পনা, পরিশ্রম ও ঝুঁকি গ্রহণের দরকার সূদভিত্তিক সঞ্চয়কারীরা তা আর করে না। বরং ব্যাংকে সঞ্চিত অর্থ হ’তে বিনাশ্রমে নির্দিষ্ট ও নির্ধারিত হারে আয় পেয়ে তারা পরিতৃপ্ত থাকে। ধীরে ধীরে আলস্য তাদের গ্রাস করে। এভাবে সূদের কারণেই যাদের হাতে অঢেল বিত্ত রয়েছে তাদের শ্রম, মেধা, দক্ষতা ও যোগ্যতার ফসল হ’তে সমাজ বঞ্চিত হয়। সৃষ্টি হয় শ্রমবিমুখতা ও অলসতা। এদেশের সাহি’ত্যে এর ভুরি ভুরি নজীর মিলবে। বাংলাদেশে বিদ্যমান সূদী ব্যবস্থায় কেউ ব্যাংকে দশ লাখ টাকা মেয়াদী জমা রেখে কোন রকম শ্রম, ঝুঁকি বা দুশ্চিন্তা ছাড়াই ঘরে বসে প্রতি মাসে ন্যূনতম দশ হাযার টাকা পেতে পারে।

৪। সূদ স্বল্প লাভজনক সামাজিক প্রয়োজনীয় খাতে বিনিয়োগকে নিরুৎসাহিত করে :

সকল অর্থনৈতিক কর্মকান্ড, তা উৎপাদনমুখীই হোক আর সেবামূলকই হোক, একই হারে মুনাফা হয় না। কোন কোন ক্ষেত্রে মুনাফার হার সূদের হারের চেয়ে বেশী, কোথাও সমান, আবার কোথাও বা কম। সাধারণভাবে বিলাস সামগ্রী ও সমাজের জন্যে অকল্যাণকর খাতে উৎপাদন ও ব্যবসায়ে মুনাফার হার হয়ে থাকে সর্বোচ্চ। প্রসাধনী ও বিলাস সামগ্রী, সৌখিন দ্রব্য, মদ ও নেশার বস্ত্ত এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ। পক্ষান্তরে সমাজের জন্য অত্যাবশ্যকীয় ও কল্যাণকর দ্রব্যসামগ্রী ও সেবার ক্ষেত্রে মুনাফার হার প্রায়শঃই খুব কম হয়ে থাকে। এমনকি তা প্রদেয় সূদের হারের চেয়েও কম হ’তে পারে। ফলে সূদভিত্তিক অর্থনীতিতে যেখানে মুনাফার হার সূদের হারের চেয়ে বেশী সেখানেই বিনিয়োগ হয় সর্বাধিক। অপরদিকে যেসব অত্যাবশ্যকীয় খাতে মুনাফার হার সূদের হারের সমান বা কম সেখানে কোন বিনিয়োগকারী এগিয়ে আসতে আগ্রহী হয় না। কারণ গৃহীত ঋণের সূদ প্রদানের পর উদ্যোক্তার আর কিছু অবশিষ্ট থাকবে না। পরিণামে সামাজিকভাবে কাম্য সেবা ও দ্রব্য সামগ্রীর উৎপাদন ও সরবরাহে সংকোচন ঘটে অনিবার্যভাবেই। অথচ সমাজের বৃহত্তর স্বার্থে এই খাতে বিনিয়োগ সবচেয়ে যরূরী। যদি অর্থনীতিতে সূদ না থাকতো তাহ’লে বিনিয়োগকারীরা (এবং মূলধনের যোগানদারেরাও) প্রাপ্তব্য মুনাফাতেই (তার হার যত কমই হোক না কেন) পুঁজি বিনিয়োগে দ্বিধা করতো না। ফলে সমাজের অপরিহার্য ও কল্যাণকর খাতের সম্প্রসারণ ও কর্মোদ্যোগের ধারাবাহিকতা বজায় রাখা সম্ভব হ’ত।

৫। সূদ নৈতিক অবক্ষয়ের অন্যতম কারণ :

সূদভিত্তিক অর্থনীতিতে নিশ্চিত আয়ের অর্থাৎ অবধারিতভাবে সূদ প্রাপ্তির লোভে অনৈতিক ও অনৈসলামী কাজে মূলধন বিনিয়োজিত হয়। উদাহরণস্বরূপ মদের ব্যবসা, ফটকাবাজারী, মজুতদারী, অনৈতিক ও কুরুচিপূর্ণ গান-বাজনা, সিনেমা, এমনকি পর্ণোগ্রাফির মতো বিষয়ে পুঁজি বিনিয়োগ করা হয়ে থাকে। এসব কাজে যেহেতু মুনাফা অর্জিত হয় তুলনামূলকভাবে অনেক বেশী হারে, সেহেতু প্রদেয় সূদ পরিশোধের পরও বিস্তর মুনাফা থেকে যায় উদ্যোক্তার হাতে। তাই তার পক্ষে চড়া হারেও সূদ পরিশোধ করা আদৌ কঠিন নয়। এই পথ ধরে সমাজে অনৈতিক ও অসামাজিক কাজের প্রসার ঘটে সহজেই। পরিণামে লক্ষ লক্ষ যুবক-যুবতী ও কিশোর-কিশোরীর সহজাত বোধ-বিশ্বাসে চিড় ধরে। ধীরে ধীরে তাদের ঈমানী চেতনার বিলুপ্তি ঘটতে শুরু করে। ক্রমেই মূল্যবোধের ক্ষয় হয় এবং প্রায় অলক্ষ্যেই সমাজে নৈতিক অধঃপতন গভীরভাবে শিকড় গেড়ে বসে। সমাজের অবক্ষয় তথা ধ্বংস হয়ে ওঠে অবশ্যম্ভাবী ও অপ্রতিরোধ্য। বস্ত্ততই মুনাফার হার তুলনামূলকভাবে কম হওয়ার কারণে সমাজ হিতকর ও কল্যাণধর্মী প্রকল্পে বিনিয়োগের জন্যে পুঁজি সংগ্রহ করা বর্তমান সময়ে অতীব দুরূহ কাজ।

৬। সূদ সমাজে ঘৃণা ও বিদ্বেষ সৃষ্টি করে :

সূদখোর মহাজন ও পুঁজিপতিরা তাদের প্রদত্ত ঋণের বিনিময়ে হাযার হাযার লোকের কঠোর শ্রমের ফসলে অন্যায্য ভাগ বসায়। শুধু তাই নয়, অনুৎপাদনশীল কাজের জন্য গৃহীত ঋণের বিপরীতে যেহেতু কোন বাড়তি আয়ের সুযোগ নেই সেহেতু এই ঋণ পরিশোধ করতে ঋণগ্রহীতাদের সহায়-সম্পত্তির উপরেও চাপ পড়ে অনিবার্যভাবেই। এমনকি ঋণের দায়ে অনেকের স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি ক্রোক হয়, পিতৃপুরুষের ভিটেমাটি ওঠে নিলামে। মানুষের আপদকালে দাবীকৃত বাড়তি এই অর্থ অর্থাৎ সূদ তাই স্বভাবতই ঋণ গ্রহীতাদের সংক্ষুব্ধ করে তোলে। মানুষ তাদেরকে বিপদের দিনে দাতা মনে করার পরিবর্তে রক্তচোষা ভ্যাম্পায়ারই মনে করে। এরা হয়ে ওঠে সমাজে ঘৃণার পাত্র।

অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়, ইসলামী অর্থনৈতিক ব্যবস্থা বিদ্যমান না থাকায় বাইতুল মাল হ’তে সাহায্য বা করযে হাসানা পাওয়ার কোন সুযোগ না থাকায় সূদভিত্তিক ঋণ নিতে বাধ্য হয় সমস্যাগ্রস্ত অসহায় নারী-পুরুষ। উপরন্তু সূদখোররা গরীব ও অসহায় কৃষকদের জমি-জিরাত ঋণের দায়ে দখল করে, ফসলের সূদ খেয়ে খেয়ে ধীরে ধীরে ফুলে ফেঁপে ওঠে, হয়ে ওঠে বিপুল সম্পদের মালিক। কখনও কখনও এমনও দেখা যায়, গৃহস্থ চাষী, ক্ষুদে খামারের মালিক সূদখোর মহাজনের ঐ জমিতে বর্গাচাষ করতে বাধ্য হচ্ছে একদিন যে জমির মালিক ছিল সে নিজেই। স্বভাবতই তখন তার মনে সৃষ্টি হয় বিদ্বেষ ও অসূয়ার যার পরিণাম ফল মোটেই শুভ নয়।

৭। সূদের কারণেই দরিদ্র আরও দরিদ্র এবং ধনী আরো ধনী হয় :

সূদের পরিণামে সামাজিক শ্রেণীবৈষম্য বেড়েই চলে। দরিদ্র অভাবগ্রস্ত মানুষ প্রয়োজনের সময়ে সাহায্যের কোন দরজা খোলা না পেয়ে উপায়ান্তর না দেখে ঋণ নিতে বাধ্য হয়। সেই ঋণ উৎপাদনশীল ও অনুৎপাদনশীল উভয় প্রকার কাজেই ব্যবহৃত হয়ে থাকে। বিশেষ করে অনুৎপাদনশীল কাজে ঋণের অর্থ ব্যবহারের ফলে তার ঋণ পরিশোধের ক্ষমতাই লোপ পায়। পুঁজিবাদী সমাজে করযে হাসানার কোন সুযোগ না থাকায় অনুৎপাদনী খাতে ঋণ তো দূরের কথা, উৎপাদনী খাতেও বিনা সূদে ঋণ মেলে না। বোঝার উপর শাকের অাঁটির মতো তাকে সূদ পরিশোধ করতে হয়। এর ফলে সে তার শেষ সম্বল যা থাকে তাই বিক্রি করে উত্তমর্ণের ঋণ শুধরে থাকে। এই বাড়তি অর্থ পেয়ে উত্তমর্ণ আরো ধনী হয়। অধমর্ণ হয় আরও দরিদ্র। বৃদ্ধি পেতে থাকে সামাজিক শ্রেণীবৈষম্য।

বাংলাদেশে একশ্রেণীর ধনী যে আরও ধনী হচ্ছে তার অন্যতম প্রধান কারণ সূদভিত্তিক ব্যাংক ও বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠানসমূহের ঋণ দানের নীতি ও কৌশল। যোগ্যতা ও আগ্রহ থাকা সত্ত্বেও দরিদ্র বা মধ্যবিত্ত উদ্যোক্তারা প্রয়োজনীয় জামানত দিতে না পারার কারণে সূদী ব্যাংকগুলো হ’তে ঋণ পায় না, অথচ বিত্তশালী ব্যবসায়ী বা শিল্প উদ্যোক্তারা সহজেই ঋণ পায়। ব্যাংক হাযার হাযার লোকের নিকট থেকে আমানত সংগ্রহ করে থাকে, কিন্তু ঐ অর্থ ঋণ আকারে পায় মুষ্টিমেয় বিত্তশালীরাই। এ থেকে উপার্জিত বিপুল মুনাফা তাদের হাতেই রয়ে যায়। ফলে সঞ্চয়কারী হাযার হাযার লোক তাদের অর্থের প্রাপ্য উচিত আয় থেকে বঞ্চিত হয়। বিত্তশালী উদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ীরা ব্যাংক ও বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠানসমূহকে যে সূদ পরিশোধ করে তা জনগণের কাছ থেকে সেবা ও দ্রব্যের মূল্যের সাথেই তুলে নেয়। ফলে ব্যাংকের দায় পরিশোধ করেও তাদের মুনাফার কোন কমতি হয় না, পরিণামে ধনীরা আরও ধনী হয়, গরীবরা হয় আরও গরীব। সমাজহিতৈষীরা তাই যতই ‘গরীবী হঠাও’ বলে চিৎকার করুক সূদের মতো এই দৃঢ়মূল, সুকৌশলী ও সর্বব্যাপী শোষণ প্রক্রিয়া বহাল থাকা অবস্থায় দারিদ্র্য দূরীকরণের কোন প্রেসক্রিপশনই কার্যকর হবে না।

অর্থনৈতিক কুফল

৮। সূদের শোষণ সার্বিক, দীর্ঘস্থায়ী ও ব্যাপক প্রকৃতির :

সূদভিত্তিক ব্যাংক ও বীমা ব্যবসার কারণে ছোট ছোট সঞ্চয় সমাবেশ ও সঞ্চালনের সুযোগে বিরাট পুঁজি গড়ে উঠছে। বীমা ও ব্যাংক ব্যবসায়ে নিযুক্ত মুষ্টিমেয় ব্যক্তি এই পুঁজি চড়া সূদে ঋণ দিয়ে বিপুল অর্থ উপার্জন করছে। একই সাথে ঋণ দেবার ক্ষেত্রে ধনী ও দরিদ্রের বাছ-বিচারের কারণে সৃষ্টি হচ্ছে ব্যাপক শ্রেণীবৈষম্য। অর্থাৎ, শ্রেণীবৈষম্য হরাস না পেয়ে আরও ব্যাপক, গভীর ও দীর্ঘস্থায়ী হচ্ছে। উপরন্তু বাংলাদেশের সূদী ব্যাংকসমূহের অনেকগুলো তাদের প্রদত্ত সূদকে ক্ষেত্রবিশেষে ‘মুনাফার’ লেবাস পরিয়ে চালিয়ে দেবার অপচেষ্টাও করছে। ফলে প্রতারিত হচ্ছে সরলপ্রাণ ধর্মভীরু মানুষ।

সূদভিত্তিক ব্যাংকিং পদ্ধতিতে শোষণ যে কত সার্বিক ও কৌশলপূর্ণ তা একটা উদাহরণের সাহায্যে তুলে ধরা হ’ল। ব্যাংকে আমানতকারীরা যে অর্থ সঞ্চিত রাখে তার পুরোটা ব্যাংক কখনই নিজের কাছে গচ্ছিত রাখে না। সাধারণতঃ ঐ অর্থের ৯০% ঋণ দিয়ে থাকে ব্যবসায়ী-বিনিয়োগকারী ও উদ্যোক্তাদের। তারা এই অর্থের জন্য ব্যাংককে যে সূদ দেয় তা আদায় করে নেয় জনগণের নিকট হ’তেই তাদের প্রদত্ত সেবা ও পণ্যসামগ্রীর মূল্যের সঙ্গেই। এদের মধ্যে ঐসব আমানতকারীরাও রয়েছে যারা ব্যাংকে অর্থ রেখেছে সূদের মাধ্যমে নিশ্চিত নিরাপদ আয়ের উদ্দেশ্যে। ব্যাংক কর্তৃপক্ষ আদায়কৃত সূদ হ’তে একটা অংশ ব্যাংক পরিচালনা ও শেয়ার হোল্ডারদের ডিভিডেন্ডের জন্য রেখে বাকি অংশ আমানতকারীদের হিসাবে জমা করে দেয় তাদের প্রাপ্য সূদ বাবদ। এভাবেই ব্যাংক ও অর্থলগ্নি প্রতিষ্ঠানগুলো মাছের তেলে মাছ ভেজে নেয়। অন্যদিকে প্রতারিত হয় আমানতকারীরা। কিন্তু তারা কি কখনও তা তলিয়ে দেখার অবকাশ পায়? বরং বছর শেষে পাশ বই বা কম্পিউটারাইজড একাউন্ট শীটে যখন জমার বিপরীতে সূদ বাবদ প্রাপ্ত অর্থ দেখে তখন তারা দৃশ্যতঃ পুলকিত বোধ করে। একটা উদাহরণের সাহায্যে বিষয়টা পরিস্কার করে তুলে ধরা যেতে পারে।

উদাহরণ-১

লেনদেনের বিবরণ

সূদের হার

ক. আমানতকারী (=ভোক্তা) ব্যবসায়ী/উৎপাদনকারীকে সূদ বাবদ মূল্যের আকারে প্রদান করে-খ. আমানতকারী ব্যাংক হ’তে সূদ বাবদ পায়-

১৬%

-৮%

=(ক-খ) ব্যাংকে সঞ্চয়ের বিপরীতে আমানতকারীর নীট লোকসান দাঁড়ায়-

= ৮%

বিদ্যমান সূদভিত্তিক ব্যাংকিং পদ্ধতি ও আইন এবং সমষ্টি অর্থনীতির (Macroeconomics) কর্মকৌশলের প্রেক্ষিতে কোনভাবেই এই অদৃশ্য অথচ প্রকৃতই লোকসান তথা শোষণ প্রতিরোধের উপায় নেই। এর প্রতিবিধান রয়েছে একমাত্র ইসলামী বিনিয়োগ ও ব্যাংকিং পদ্ধতির কর্মকৌশলের মধ্যে।

৯। সূদের কারণেই ভূমিহীন কৃষকের সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে :

কৃষকেরা ফসল ফলাবার তাগিদেই নিজেরা খেতে না পেলেও ঋণ করে জমি চাষ করে থাকে। প্রয়োজনের সময়ে প্রাতিষ্ঠানিক ঋণ পাওয়া এদের জন্যে দুরূহ। তাই গ্রামেরই সচ্ছল লোকের দ্বারস্থ হয় তারা। বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলে একদল লোক এদেরকে সাহায্য করার জন্যে তৈরীই থাকে। গ্রামাঞ্চলে এসব সূদখোররা সাধারণতঃ ‘মহাজন’ নামেই অধিক পরিচিত। এরা শুধু গ্রামাঞ্চলেই আছে এমন নয়, নগরে-বন্দরে, গঞ্জে-মোকামেও এরা পরিচিত মুখ। এদের অনেকে আবার দাদন ব্যবসায়ী হিসাবেও পরিচিত। এরা প্রান্তিক কৃষক, বর্গাচাষী, ক্ষুদে ব্যবসায়ী সকলকেই টাকা ধার দেয়, ধান যোগান দেয়। শর্ত থাকে ফসল উৎপাদনের মৌসুমের শুরুতে অথবা আষাঢ়-শ্রাবণ মাসে নেওয়া ঋণের জন্যে ঋণ শোধ না হওয়া পর্যন্ত প্রতিমাসে প্রতি হাযারে টাঃ ২০০/= হারে সূদ দিতে হবে। অথবা প্রতি মণ ধানের বদলে ঐ সময়ে দ্বিগুণ ধান দিয়ে ঋণ পরিশোধ করতে হবে। যুক্তি হ’ল, এরা টাকা বা ধান ঋণ দিয়ে ফসল উৎপাদনে সহায়তা করেছে। সুতরাং, এই উপকার বা সহযোগিতার বিনিময়ে কিছু ‘পারিতোষিক’ তো প্রাপ্য হ’তেই পারে। উল্লেখ্য, জাহিলীয়াতের যুগে আরব ভূখন্ডে এভাবে খেজুর লগ্নির প্রথা বহুল প্রচলিত ছিল। ফলে দেখা যায়, ফসল তোলার পর নগদ অর্থ বা ফসলের সূদসহ ঋণ পরিশোধের পর কৃষকের হাতে আর তেমন কিছুই উদ্বৃত্ত থাকে না। তাকে আবার ঋণ করতে হয় সংসার চালাবার জন্যে। ঋণের এই অশুভ চক্র হ’তে সে বেরিয়ে আসতে পারে না। ক্রমেই তার ঋণের পরিমাণ বাড়ে। এক সময়ে জমি-জিরাত ভিটেমাটি দখল করে নেয় জমিখেকো মহাজনরা।

কৃষকরা এই ঋণ শুধু যে গ্রামের মহাজনের কাছ থেকেই নেয় তা নয়। সরকারের কৃষি ব্যাংক থেকেও নেয়, নেয় অন্যান্য বাণিজ্যিক ব্যাংক ও সমবায় প্রতিষ্ঠান থেকেও। যথোপযুক্ত বা আশানুরূপ ফসল হওয়া সব সময়েই অনিশ্চিত। তাছাড়া প্রাকৃতিক দুর্যোগ তো রয়েছেই। যদি ফসল আশানুরূপ না হয় বা আকস্মিক বন্যা, খরা, ঘূর্ণিঝড় প্রভৃতি প্রাকৃতিক দুর্যোগের ফলে ফসল খুবই কম হয় বা মোটেই না হয় তবু কিন্তু কৃষককে নির্দিষ্ট সময়ান্তে সূদসহ ঋণ পরিশোধ করতে হয়। তখন হয় তাকে আবার নতুন ঋণের সন্ধানে বের হ’তে হয় অথবা জমি-জিরাত বেচে কিংবা বন্ধক রেখে সূদ আসলসহ ঋণ পরিশোধ করতে হয়। তা না হ’লে কি মহাজন, কি ব্যাংক সকলেই আদালতে নালিশ ঠুকে তার সহায়-সম্পত্তি ক্রোক করিয়ে নিবে। নিলামে চড়াবে দেনার দায়ে।

প্রাসঙ্গিকভাবেই এখানে একটা উদাহরণ তুলে ধরা যেতে পারে। ধরা যাক, কোন ব্যাংক হ’তে আলু চাষের জন্য কৃষক ১৬% সূদে টাকা ১০,০০০/= ঋণ নিল। এজন্যে তাকে বছর শেষে বাড়তি টাঃ ১৬০০/= পরিশোধ করতে হবে। তাই ঐ কৃষকের জমিতে অবশ্যই আরও বেশী আলু উৎপন্ন হওয়া দরকার। আলুর দাম গড়ে টাঃ ৪০০/= মণ হ’লে বাড়তি চার মণ আলু উৎপাদন হওয়া চাই। মজা হ’ল আলুর ফলন বেশী হ’লে তা সবারই ক্ষেতে হবে। ফলে দাম পড়ে যাবে। আলুর দাম যদি মণ প্রতি টাঃ ৪০০/= হ’তে টাঃ ৩৫০/= তে নেমে আসে তাহ’লে চাষীর মণ প্রতি টাঃ ৫০/= অর্থাৎ ঐ আলুতেই তার টাঃ ২০০/= ঘাটতি থেকে যাবে। মোট বিক্রিত আলুতে ঘাটতির পরিমাণ যে আরও বেশী হবে তা বলাই বাহুল্য। উপরন্তু ঋণের পরিমাণ যত বেশী হবে ঘাটতির পরিমাণও তত বেশী হবে। বাংলাদেশের বাস্তব চিত্র কী? ১৯৪৭ সালে ভারত বিভাগের সময়ে তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানের কৃষকদের ২৭% ভূমিহীন ছিল। কিন্তু মাত্র ৩৭ বছরের মধ্যে এর চিত্র পাল্টে গেছে। ১৯৮৩-৮৪ সালের কৃষি শুমারী হ’তে দেখা যায়, বাংলাদেশে ভূমিহীন কৃষক পরিবারের সংখ্যা মোট কৃষিনির্ভর পরিবারের ৬৮.৮% এ দাঁড়িয়েছে (সূত্র : স্ট্যাটিস্টিকাল পকেট বুক অব বাংলাদেশ ১৯৯৬, বাংলাদেশ ব্যুরো অব স্ট্যাটিস্টিকস, পৃ. ১৭৯)

প্রসঙ্গতঃ মনে রাখতে হবে, বাংলাদেশ সৃষ্টির পর হ’তেই এদেশে কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক কৃষকদের অব্যাহতভাবে ঋণ দেওয়া শুরু করে। রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমানের আমলে ২৫ বিঘা পর্যন্ত কৃষি জমির খাজনা প্রদান রহিত করা হয়। রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের আমলে তাঁর নির্দেশে দেওয়া একশ কোটি টাকার আই.আই.সি.পি. ঋণ দেওয়া হয়, যার প্রায় সবটাই আজও অনাদায়ী রয়ে গেছে। এরপরও বেগম খালেদা জিয়া প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর তাঁর দেওয়া নির্বাচনী ওয়াদা মুতাবিক তখন পর্যন্ত কৃষকদের কাছে প্রাপ্য পাঁচ হাযার টাকা পর্যন্ত কৃষি ঋণ মওকুফ করা হয়েছিল। এরপরেও কেন দেশে ভূমিহীন কৃষকের সংখ্যা ক্রমাগত বাড়ছে? এর অন্যতম প্রধান কারণ সূদভিত্তিক ঋণ প্রদান বা গ্রহণ। শুধু এদেশেই নয়, যে সমস্ত দেশে কৃষি উৎপাদনে ব্যাপক কৌশলগত কোন পরিবর্তন ঘটেনি অথবা মূল্য সহায়তা (price support) বা উপাদান ভর্তুকী (input subsidy) আকারে বিশেষ সরকারী সহায়তা দেওয়া হয়নি সেসব দেশে সূদনির্ভর লেনদেনে ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক চাষীরা ক্রমেই ভূমিহীন হয়ে যাচ্ছে।

১০। সূদের ফলে একচেটিয়া কারবারের প্রসার ঘটে :

বড় বড় ব্যবসায়ীরা যে শর্তে ও যে সময়ের জন্য ব্যাংক ও অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠান হ’তে ঋণ পেতে পারে ছোট ব্যবসায়ীরা সেভাবে ঋণ পায় না। এজন্য প্রতিযোগিতার ক্ষেত্রেও তারতম্য ঘটে। সে প্রতিযোগিতায় অসম সুবিধা ভোগের সুযোগ নিয়ে বড় কারবারী বা ব্যবসায়ী আরো বড় হয়। ছোট কারবারী বা ব্যবসায়ী টিকতে না পেরে ধ্বংস হয়ে যায়। বৃহদায়তন শিল্প-কারখানা প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রেও তাই। এই জাতীয় শিল্প-কারখানা প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে শুধু ব্যাংকই নয়, বিনিয়োগ কোম্পানী ও অনৈসলামী সরকারসমূহ যে বিশেষ সুবিধা ও ন্যূনতম সূদের হারে টাকা ঋণ দিয়ে থাকে, ছোট বা ক্ষুদ্রায়তন শিল্পের জন্য আদৌ সে সুযোগ নেই। ফলে বড় শিল্পপতিরা প্রতিযোগিতাহীন বাজারে একচেটিয়া কারবারের সমস্ত সুযোগ লাভ করে। পরিণামে অর্থনৈতিক বৈষম্য আরো প্রকট হয়।

১১। সূদের কারণে মুষ্টিমেয় লোকের মধ্যেই পুঁজি আবর্তিত হয় :

সূদ আদায় ও প্রদানের সামর্থ্যের কারণেই বিত্তবান ঋণদাতা ও গ্রহীতাদের হাতেই পুঁুজি আবর্তিত হ’তে ও বৃদ্ধি পেতে থাকে। সূদভিত্তিক অর্থনীতিতে ব্যাংক, বীমা প্রতিষ্ঠান, বিনিয়োগ কোম্পানী তথা অর্থলগ্নী প্রতিষ্ঠান এবং ধনিক শ্রেণীর মধ্যে একটা অদৃশ্য সেতুবন্ধন বা যোগসাজশ লক্ষ্য করা যায়। উপরন্তু উত্তরাধিকার সূত্রে, অবৈধভাবে বা অন্য কোন উপায়ে কেউ প্রচুর অর্থ সঞ্চয় করতে পারলে সূদের বদৌলতেই সে তা ক্রমাগত বৃদ্ধি করে যেতে পারে। পক্ষান্তরে পর্যাপ্ত জামানত দিতে না পারার কারণে স্বল্পবিত্তদের এখানে কোন ঠাঁই নেই। ফলে বিত্তশালীরা একাধারে সমাজকে শোষণ করে এবং একচেটিয়া কারবারেরও প্রসার ঘটে। সমাজে সৃষ্টি হয় অর্থনৈতিক নানা বিপর্যয়। এজন্যেই আল্লাহ রাববুল ‘আলামীন আল-কুরআনে বলেছেন, كَيْ لاَ يَكُوْنَ دُوْلَةً بَيْنَ الْأَغْنِيَاءِ مِنْكُمْ، ‘সম্পদ যেন কেবলমাত্র (তোমাদের) ধনীদের মধ্যে আবর্তিত না হয়’ (হাশর ৫৯/৭)

১২। সূদ দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কারণ :

সূদবিহীন অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় উৎপাদনকারী উৎপাদন খরচের উপর পরিবহন খরচ, শুল্ক (যদি থাকে), অন্যান্য আনুষঙ্গিক ব্যয় এবং স্বাভাবিক মুনাফা যোগ করে পণ্যসামগ্রীর বিক্রি মূল্য নির্ধারণ করে থাকে। কিন্তু সূদভিত্তিক অর্থনীতিতে দ্রব্যের এই স্বাভাবিক মূল্যের উপর উপর্যুপরি সূদ যোগ করে দেওয়া হয়। দ্রব্য বিশেষের উপর তিন থেকে চার বার পর্যন্ত, ক্ষেত্রবিশেষে তারও বেশীবার সূদ যুক্ত হয়ে থাকে। উদাহরণস্বরূপ আমাদের দেশের বস্ত্রশিল্পের কথাই ধরা যেতে পারে। এই শিল্পের প্রয়োজনে তুলা আমদানী করতে হয়। আমদানীকারকরা ব্যাংক হ’তে যে ঋণ নেয় বিদেশ থেকে তুলা আমদানীর জন্য তার সূদ যুক্ত হয় ঐ তুলার বিক্রয় মূল্যের উপর। এরপর সুতা তৈরীর মিল ব্যাংক হ’তে যে ঋণ নেয় তারও সূদ যুক্ত হয় ঐ তুলা থেকে তৈরী সুতার উপর। পুনরায় ঐ সুতা হ’তে কাপড় তৈরীর সময়ে বস্ত্রকল সংস্থা বা কোম্পানী যে ঋণ নেয় সেই সূদ যুক্ত হয় কাপড়ের উপর। এরপর কাপড়ের এজেন্ট বা ডিলার তার ব্যবসার উদ্দেশ্যে ব্যাংক হ’তে যে ঋণ নেয় তারও সূদ যোগ করে দেয় ঐ কাপড়ের কারখানা মূল্যের উপর। এভাবে চারটি স্তর বা পর্যায়ে সূদের অর্থ যুক্ত হয়ে বাজারে কাপড় যখন খুচরা দোকানে আসে বা প্রকৃত ভোক্তা ক্রয় করে তখন সে আসল মূল্যের চেয়ে অনেক বেশী দাম দিয়ে থাকে।

একটা নমুনা হিসাবের সাহায্যে বিষয়টি ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করা হ’ল। ধরা যাক, বিদেশ হ’তে তুলা আমদানীর জন্যে কোন ব্যবসায়ী ব্যাংক হ’তে এক লক্ষ টাকা ঋণ নিল। এরপর বিভিন্ন পর্যায় পার হয়ে তা থেকে তৈরী কাপড় বাজারে ভোক্তার কাছে পৌঁছানো পর্যন্ত সূদজনিত মূল্য বৃদ্ধির চিত্রটি কেমন দাঁড়াবে? সঠিক অবস্থা বোঝার জন্যে দুটো অনুমিতি (Assumption) এখানে ধরা হয়েছে : (ক) উৎপাদন, বিপণন, গুদামজাতকরণ প্রভৃতি প্রতিটি ক্ষেত্রেই ব্যাংক হ’তে ঋণ নেওয়া হয়েছে, এবং (খ) সূদের হার সকল ক্ষেত্রেই ১৬%। এই উদাহরণে বিভিন্ন পর্যায়ের অন্যান্য আবশ্যকীয় ব্যয় (যেমন- জাহাজ ভাড়া, কুলি খরচ, বিদ্যুৎ/জ্বালানী ব্যয়, গুদাম ভাড়া, পরিবহন ব্যয়, শ্রমিকের বেতন/মজুরী, সরকারী কর/শুল্ক ইত্যাদি) হিসাবের মধ্যে ধরা হয়নি।

উদাহরণ-২

ক. আমদানীকারীর আমদানীকৃত তুলার ক্রয়মূল্য টা: ১,০০,০০০/= হ’লে তার বিক্রয়মূল্য দাঁড়ায় টাঃ ১,১৬,০০০/=।

খ. সুতা তৈরীর মিলের তুলার ক্রয়মূল্য টাঃ ১,১৬,০০০/= হ’লে সুতার বিক্রয়মূল্য দাঁড়ায় টাকা: ১,৩৪,৫৬০/=।

গ. কাপড় তৈরীর মিলের সুতার ক্রয়মূল্য টাঃ ১,৩৪,৫৬০/= হ’লে কাপড়ের বিক্রয়মূল্য দাঁড়ায় টাঃ ১,৫৬,০৮৯/=।

ঘ. মিল হ’তে এজেন্ট/ডিলারের কাপড়ের ক্রয়মূল্য টাঃ ১,৫৬,০৮৯/= হ’লে কাপড়ের বিক্রয়মূল্য দাঁড়ায় টাঃ ১,৮১,০৬৪/=।

ঙ. এজেন্ট/ডিলারের কাছ থেকে পাইকারী বিক্রেতার কাপড়ের ক্রয়মূল্য টা: ১,৮১,০৬৪/= হ’লে তার বিক্রয়মূল্য দাঁড়ায় টাঃ ২,১০,৬৪/=।

এখানে দেখা যাচ্ছে যে, যে তুলার ক্রয়মূল্য ছিল টাঃ ১,০০,০০০/= সেই তুলা হ’তে তৈরী কাপড় ভোক্তার নিকট পর্যন্ত পৌঁছাতে সূদ বাবদেই মূল্যের সাথে অতিরিক্ত টাঃ ১,১০,০৩৪/= যুক্ত হয়েছে, যা ভোক্তাকেই দিতে হবে। কারণ চূড়ান্ত বিচারে শেষ অবধি প্রকৃত ভোক্তাই মোট সূদের ভার বহন করে। এর অন্তর্নিহিত অর্থই হচ্ছে সূদ দিতে না হ’লে অর্থাৎ সূদ উচ্ছেদ হ’লে এই অতিরিক্ত বিপুল অর্থ (টাকা পিছু অতিরিক্ত ১.১০ টাকা) ভোক্তাকে দিতে হ’ত না।

এভাবে দৈনন্দিন জীবনের নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদির প্রত্যেকটিতেই প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সূদ জড়িয়ে আছে। নিরুপায় ভোক্তাকে বাধ্য হয়েই সূদের জন্যে সৃষ্ট এই চড়া মূল্য দিতে হয়। কারণ সূদভিত্তিক অর্থনীতিতে এছাড়া তার গত্যন্তর নেই। অথচ সূদ না থাকলে অর্থাৎ ইসলামী অর্থনীতি চালু থাকলে এই যুলুম হ’তে জনসাধারণ রেহাই পেত। এতে শুধু তাদের জীবন যাত্রার ব্যয়ই কম হ’ত না, জীবন যাপনের মান হ’ত আরো উন্নত।

১৩। সূদ মজুরী বৃদ্ধির অন্যতম বড় প্রতিবন্ধক :

সূদের হার উচ্চ থাকলে বিনিয়োগ থাকে ন্যূনতম কোঠায়। তখন শিল্প উদ্যোক্তার পক্ষে মুনাফা অর্জনই কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। সে সময়ে মজুরী বৃদ্ধি মানেই লোকসানের ঝুঁকি নেওয়া। সূদী-অর্থনীতিতে সূদের হার খুব কম থাকলে বিনিয়োগকারীর সংখ্যা বেশী হ’তে পারে কিন্তু পুঁজির সরবরাহ বৃদ্ধি পায় না। সেক্ষেত্রে বিনিয়োগ কম হওয়ার ফলে শ্রমিকের চাহিদাও কম থাকে। অন্যদিকে চাহিদার তুলনায় শ্রমিকের যোগান অনেক বেশী থাকায় শ্রমিকদের দিক থেকে মজুরী বৃদ্ধির দাবী উত্থাপন আদৌ সহজ হয় না। উপরন্তু বিদ্যমান কম মজুরীতেই চাহিদার চেয়ে শ্রমিকের যোগান বেশী হওয়ায় উদ্যোক্তারা মজুরী বৃদ্ধির দাবী সহজে মেনে নিতে চায় না। ফলে অনিবার্যভাবেই সংঘাত দেখা দেয়। শ্রমিকরা কর্মবিরতি, ঘেরাও, ধীরে চলো, ধর্মঘট, হরতাল, অবস্থান ধর্মঘট প্রভৃতি কর্মসূচীর আশ্রয় নেয়। পরিণামে মালিক পক্ষ ছাঁটাই, লেঅফ, লক আউট ইত্যাদি কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করে থাকে। পূর্বেই বলা হয়েছে, সূদের কারণে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি পায়। ফলে বিক্রিও হরাস পায়। এই অবস্থায় মজুরী বৃদ্ধি পেলে মুনাফার হার হরাস পেয়ে সূদের হারের চেয়েও নিচে নেমে যেতে পারে। তাই মজুরী বৃদ্ধির কোন দাবীই শিল্প মালিকদের পক্ষে বিবেচনায় আনা সম্ভব হয় না।

এই কারণেই জাপানে মেইজী শাসন আমলে মজুরী বৃদ্ধির জন্য শ্রমিকদের জোর দাবী থাকলেও যাইবাৎসু গোষ্ঠী তা মেনে নেয়নি, সরকারও এ ব্যাপারে শ্রমিকদের সমর্থনে এগিয়ে আসেনি। বৃটেনেও কৃষকদের স্বার্থে প্রণীত ১৮১৫ সালের শস্য আইন (Corn Law) ত্রিশ বছর পরেই বাতিল করা হয় শিল্পপতিদের স্বার্থে। শস্য আইন বহাল থাকলে গমের দাম বৃদ্ধি পেতো। এতে কৃষকেরা লাভবান হ’ত। কিন্তু শিল্প শ্রমিকদের মজুরী বৃদ্ধি করাও অপরিহার্য হয়ে পড়তো যার ফলে অবশ্যম্ভাবীভাবে শিল্পপতিদের মুনাফা হরাস পেতো। ফলে তাদের স্বার্থহানি ঘটতো। তাই তারা আন্দোলন করেছিল ঐ আইন বাতিল করার জন্যে।

১৪। সূদ দীর্ঘ মেয়াদী বৃহৎ বিনিয়োগকে নিরুৎসাহিত করে :

সূদনির্ভর ব্যাংক ব্যবস্থায় ব্যাংকগুলো দীর্ঘ সময় ধরে পুঁুজি আটকে থাকার সম্ভাবনা রয়েছে এমন ধরনের বিনিয়োগে আদৌ উৎসাহ দেখায় না। এজন্যেই ব্যয়বহুল বড় শিল্প-কারখানা সূদী ব্যাংকের অর্থায়নে গড়ে উঠতে পারে না। এসব শিল্প-কারখানা স্থাপনে যে বিপুল অর্থের প্রয়োজন হয় তা সূদের ভিত্তিতে যোগান দিলে প্রতি বছর বিপুল অংকের অর্থ সূদ হিসাবে পরিশোধ করতে হবে। বড় বড় মিল-কারখানা সাধারণতঃ প্রতিষ্ঠিত হয়ে চালু হ’তে দুই হ’তে তিন বছরের gestation period প্রয়োজন হয়। এই দীর্ঘ সময়ে সূদের পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়ে এমন অংক দাঁড়াবে যে সে বোঝা বহন করা লাভজনক শিল্পের পক্ষেও সম্ভব নয়। আর লোকসান হ’লে সূদে-আসলে ঋণের যে অংক দাঁড়ায় তা পরিশোধ করা কখনো সম্ভব হয় না। স্বাভাবিকভাবেই উদ্যোক্তা তখন দেউলিয়া হ’তে বাধ্য হয়। একমাত্র মতলববাজ ঋণখেলাপীরাই তথ্যবিকৃতি ঘটিয়ে ব্যাংক হ’তে বড় আকারের বিনিয়োগ গ্রহণ করে শিল্প বা কারখানা প্রতিষ্ঠার জন্যে। কারখানা গড়ে তুললেও তারা আর কখনও ঋণ পরিশোধ করে না। বছরের পর বছর গড়িয়ে যায়। এর অশুভ প্রতিক্রিয়ার শিকার হয় দেশের অর্থনীতি।

১৫। সূদ সঞ্চয়কে অনুৎপাদনশীল সরকারী বিনিয়োগে উৎসাহিত করে :

সূদী অর্থনীতির ব্যাংক ব্যবস্থায় ব্যাংকাররা ঝুঁকিমুক্ত, নিশ্চিত ও নির্ধারিত আয় পাওয়ার উদ্দেশ্যে জনগণের গচ্ছিত আমানতের বিরাট এক অংশ ট্রেজারী বিল ক্রয়, বিনিময় বিল ভাঙানো, সরকারী সিকিউরিটি বা ঋণপত্র ক্রয় ইত্যাদি অনুৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগ করে থাকে। ফলে উৎপাদনশীল কাজে বিনিয়োগের জন্যে প্রয়োজনীয় পুঁুজির অভাব দেখা দেয়। পরিণামে সূদের হার বৃদ্ধি পায় এবং পুঁজির প্রান্তিক দক্ষতা আরো হরাস পায়। ফলশ্রুতিতে বিনিয়োগ ও উৎপাদনের পরিমাণ হরাস পায়। যুগপৎ কর্মসংস্থানের সংকোচন হয় ও দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি পায়। অর্থনীতিতে সৃষ্টি হয় সংকটের। এই অবস্থায় শেষ পর্যন্ত সরকারকেই এগিয়ে আসতে হয় সংকট মোচনের জন্যে।

১৬। সূদের কারণে জনগণের ক্রয়ক্ষমতা ক্রমশঃ হ্রাস পেতে থাকে :

পূর্বেই দেখানো হয়েছে যে, সূদের কারণেই দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি পায় অবশ্যম্ভাবীভাবে ও অপ্রতিহত গতিতে। উপরন্তু অব্যাহত মুদ্রাস্ফীতি ঘটার অন্যতম কারণও সূদ। এই দুইয়ের যোগফলে সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাস ওঠে। নির্দিষ্ট আয়ের শ্রমজীবী, সাধারণ কৃষিজীবী, নানা ধরনের পেশাজীবী ও বেতনভুক্ত  কর্মচারীরা  এই  সাধারণ মানুষের কাতারে শামিল। এদের আয়ের স্তর ও পরিমাণ যেহেতু মোটামুটি একটা দীর্ঘ সময় ধরে একই রকম থাকে সেহেতু দ্রব্যসামগ্রীর মূল্যবৃদ্ধির ফলে ক্রয়ক্ষমতা হরাস পায়। ফলে একদিকে জীবন যাপনের মানের অবনতি ঘটে, অন্যদিকে বাজারে কার্যকর চাহিদারও সংকোচন ঘটে। এরই চূড়ান্ত পরিণাম হিসাবে কলকারখানায় মুনাফার পরিমাণ হরাস পায়, নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির সম্ভাবনাও রুদ্ধ হয়ে যায়। অনেক ক্ষেত্রে মুনাফার পরিমাণ ঠিক রাখার জন্যে পুনরায় মূল্যবৃদ্ধি ঘটায় শিল্প-উদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ীরা। জনসাধারণের ক্রয় ক্ষমতা তখন কমে যায় আরও এক ধাপ।

১৭। সূদভিত্তিক ঋণে তৈরী প্রতিষ্ঠান ক্ষতির সম্মুখীন হ’লে উদ্যোক্তা পর্যুদস্ত হয়ে পড়ে :

উদ্যোক্তা যতক্ষণ ব্যাংকের সূদ পরিশোধ করে ততক্ষণ ব্যাংক তার ঋণ মঞ্জুরী অব্যাহত রাখে। এমনকি ঋণের পরিমাণও বৃদ্ধি করে। কিন্তু যখনই কারবারে লোকসান দেখা দেয়, তখন ব্যাংক নতুন অর্থলগ্নি করা দূরে থাক পূর্বের ঋণ ফেরত দেবার জন্যেই চাপ দেয়। এই অবস্থায় উদ্যোক্তা মাথায় হাত দেয়। কারণ তার নিজের পুঁজি ছিল সামান্যই, পুরো ব্যাপারটিই ছিল পরের ধনে পোদ্দারী। ফলে এই ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়া তার পক্ষে সম্ভব হয় না। পরিণামে গোটা কারবারটি বন্ধ বা ধ্বংস হয়ে যায়।

১৮। সূদভিত্তিক ঋণের কারণে ব্যক্তির/প্রতিষ্ঠানের দেউলিয়াত্বের বোঝা চাপে সমগ্র জাতির ঘাড়ে :

বাংলাদেশ এর উজ্জ্বলতম উদাহরণ। ধনী ব্যবসায়ী বা শিল্পপতিরা নির্দিষ্ট হারে সূদ প্রদানের অঙ্গীকারে তাদের দেওয়া Collateral বা জামানতের বিপরীতে ব্যাংক ও অর্থলগ্নিকারী প্রতিষ্ঠানগুলো হ’তে দশগুণ বা তারও বেশী পরিমাণ ঋণ পেয়ে থাকে। অর্থাৎ নিজেদের দশ লক্ষ টাকা থাকলে তারা এক কোটি টাকা ঋণ পায়। এক্ষেত্রে অনেক সময় রাজনৈতিক প্রভাব বা সম্পৃক্ততাও বিশেষ ভূমিকা পালন করে থাকে। কোটি টাকারও বেশী এই অর্থের ব্যবসা বা শিল্পে যে মুনাফা হয় তার সবটুকুই ভোগ করে ঐ ঋণগ্রহণকারী উদ্যোক্তা। ব্যাংকে অর্থ আমানতকারীরা সূদ পেলেও মুনাফার কোন অংশই তারা পায় না। অথচ লোকসানের কারণে ঐ প্রতিষ্ঠান দেউলিয়া হ’লে তার দায়ভার চাপে গোটা জাতির উপর। জনগণের সঞ্চয় তখন আর ফেরত পাওয়ার সম্ভাবনা থাকে না। এক্ষেত্রে উদ্যোক্তার দৃশ্যমান লোকসান ঐ দশ লক্ষ টাকা হ’লেও (যদিও পূর্বের মুনাফা সে পুরোটা একাই ভোগ করেছে) জনসাধারণের লোকসান অনেক ক্ষেত্রে পুরো কোটি টাকাই। কষ্ট করে এই টাকা যারা সঞ্চয় করে ব্যাংকে আমানত রেখেছিল তাদেরই এখন ফতুর হবার পালা।

বাংলাদেশের ঋণখেলাপী শিল্প উদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ীদের সমুদয় সম্পত্তি বিক্রি করে দিলেও ব্যাংক হ’তে তাদের গৃহীত ঋণ শোধ হবার নয়। কারণ এর পেছনে অদৃশ্য হাতের কারসাজি কাজ করেছে। রাজনৈতিক মদদে ঋণ পাইয়ে দেওয়া হয়েছে অথবা ব্যাংকের বোর্ড অব ডিরেক্টরসের সদস্যরাই নামে-বেনামে ঋণ নিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশের কোন তোয়াক্কা না করেই। অনেক ক্ষেত্রে যথাযথ প্রকল্প সমীক্ষাও করা হয়নি। শুধুমাত্র সূদের হিসাব কষেই কল্পিত মুনাফার লোভনীয় টোপ দিয়ে হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে হাযার হাযার কোটি টাকা, যা আর কোন দিনই ব্যাংকে ফিরে আসবে না। রাষ্ট্রায়ত্ত্ব ব্যাংকগুলো সরকারী তহবিলের মদদ পেলেও বেসরকারী ব্যাংকগুলো এই দায় উদ্ধারের জন্য কার মদদ পাবে?

১৯। সূদ অর্থনীতিতে অস্থিতিশীলতার মুখ্য কারণ :

একথা সর্বজনবিদিত যে পুঁজি বাজারে মূলধনের চাহিদা হরাস পেলে সূদের হার হরাস পায়, আবার মূলধনের চাহিদা বৃদ্ধির সাথে সাথে সূদের হারও বৃদ্ধি পায়। বিভিন্ন দেশের সূদের হারের ওঠানামা কালীন সারির তথ্য (Time series data) বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, কোন দেশে সূদের হার দীর্ঘকাল স্থিতিশীল থাকতে পারে না। অর্থনৈতিক কর্মকান্ডে কোন কারণে তেজীভাব শুরু হ’লে মূলধনের চাহিদা বৃদ্ধি পেতে শুরু করে। পুঁজির যোগানদার তখন সূদের হার বাড়িয়ে দেয়। ফলশ্রুতিতে পুঁজির চাহিদা হরাস পেতে শুরু করে, এমনকি কোন কোন ক্ষেত্রে তা পূর্বের চেয়েও হরাস পায়। এর মুকাবিলায় সূদের হার আবারও হরাস করা হয়। পুনরায় মূলধনের চাহিদা বৃদ্ধির সাথে সাথে সূদের হার বৃদ্ধি পেতে শুরু করে। এভাবে সূদের হারের ঘন ঘন ওঠানামার কারণে বিনিয়োগকারীরা নিক্ষিপ্ত হয় অনিশ্চয়তার মধ্যে। এরই ফলে বিনিয়োগ, শেয়ার, পণ্য ও মুদ্রা বাজারে দারুণ অস্থিরতা ও অনিশ্চয়তা দেখা দেয়। মারাত্মক বিরূপ প্রতিক্রিয়ার শিকার হয় দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকান্ড। এর বাস্তব চিত্র ফুটে উঠেছে সাম্প্রতিক সময়ের মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিতে। বহু ব্যাংক দেউলিয়া হয়ে যায়, বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয় বড় বড় শিল্প প্রতিষ্ঠান। শেষ অবধি সরকারকে ৭০০ বিলিয়ন ডলারের সহযোগিতা ‘প্যাকেজ’ মঞ্জুর করতে হয়। তবু সেই মন্দার ধকল এখনও সামলে উঠতে পারেনি মার্কিন অর্থনীতি।

২০। সূদের দীর্ঘমেয়াদী কুফলস্বরূপ অর্থনীতিতে মন্দা দেখা দেয় :

সূদভিত্তিক বিনিয়োগ ও ব্যবসার কারণে অর্থনীতিতে বারবার মন্দা ও তেজীভাবের আবর্তন হ’তে থাকে। এর ফলে সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকান্ডে সব সময় অস্থিরতা ও অনিশ্চয়তা বিরাজ করে। যে কোন অর্থনীতির জন্যে এ অবস্থা অনাকাঙ্খিত। অর্থনীতিতে যখন তেজীভাব থাকে তখন সূদের হার বৃদ্ধি পেতে থাকে। এভাবে সূদের হার যখন অতিরিক্ত বৃদ্ধি পায় তখন ঋণ গ্রহীতারা হিসাব করে যদি দেখে যে অতিরিক্ত সূদের হারের কারণে লাভের সম্ভাবনা কম, তখন তারা ঋণ নেওয়া বন্ধ করে দেয়। তখন পুঁজি বিনিয়োগে ভাটা পড়ে, উৎপাদন কমে যায়, শ্রমিক ছাঁটাই হয়, ব্যবসায়ে সৃষ্টি হয় মন্দা। এভাবে পুঁজির চাহিদা কমে গেলে বিনিয়োগ বৃদ্ধির আশায় ব্যাংক সূদের হার কমিয়ে দেয়। ব্যবসায়ী ও শিল্পপতিরা নতুন করে ঋণ নিয়ে তখন উৎপাদন ও ব্যবসা-বাণিজ্যে মন দেয়। ক্রমে মন্দা কেটে গিয়ে পুনরায় তেজীভাবের সৃষ্টি হয়। এভাবে বারবার মন্দা ও তেজী অবস্থার সৃষ্টি অর্থনীতির জন্যে যে অত্যন্ত অশুভ ও ভয়াবহ পরিণতির জন্ম দেয় সে বিষয়ে পুঁজিবাদী অর্থনীতির শ্রেষ্ঠ প্রবক্তারাও একমত।

অনেকের ভ্রান্ত ধারণা রয়েছে সঞ্চয় বৃদ্ধির ক্ষেত্রে সূদের ভূমিকা খুব গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু সূদ আসলেই অর্থনীতির জন্যে অপরিহার্য নয়, সঞ্চয়ের জন্যে তো নয়ই। বরং তা অর্থনৈতিক অগ্রগতির প্রতিবন্ধক। সূদনির্ভর পুঁজিবাদী অর্থনীতির অন্যতম পুরোধা বিশ্ববিশ্রুত অর্থনীতিবিদ লর্ড জন মেনার্ড কেইন্স তাঁর সুবিখ্যাত গ্রন্থ The General Theory of Employment, Interest and Money-তে প্রমাণ করেছেন সঞ্চয়ে সূদের কোন ভূমিকা নেই। সূদ বিদ্যমান না থাকলেও লোকে ব্যক্তিগত কারণেই অর্থ সঞ্চয় করবে। দুর্দিনের খরচ ও আকস্মিক বড় ধরনের ব্যয় মেটাবার প্রয়োজনেই তারা সঞ্চয় করে।

২১। সূদ ধন বণ্টনে অসমতার অন্যতম কারণ ও পূর্ণ কর্মসংস্থানের পথে বিরাট প্রতিবন্ধক :

কেইন্স দেখিয়েছেন সূদের জন্যেই বরং বিনিয়োগ সীমিত হয়ে পড়ে। যে কোন দেশের অর্থনীতির পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে সূদের উচ্চ হারের সময়ে বিনিয়োগের পরিমাণ হরাস পেয়েছে, অর্থনৈতিক কর্মপ্রয়াস সংকুচিত হয়েছে। অপরদিকে সূদের হার যখন ন্যূনতম তখনই বিনিয়োগের পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়েছে। একই সঙ্গে অর্থনৈতিক কর্মপ্রয়াসও বেড়ে গেছে। কেইনসের মতে সূদের হার যখন শূন্য, তখনই পূর্ণ কর্মসংস্থান অর্জনের লক্ষ্য পূরণ হয়। বাংলাদেশের শিল্পকারখানার সাম্প্রতিক অবস্থার প্রতি নজর দিলে এই সত্য সহজেই অনুধাবনযোগ্য। দেশের মূল্যবান বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন এবং রপ্তানী আয়ের অন্যতম প্রধান উৎস গার্মেন্টস ও নীটওয়্যার শিল্পের কারখানা মালিকেরা সমস্বরে দাবী তুলেছে বিদ্যমান সূদের হার হরাস করার জন্যে। বাণিজ্যিক ব্যাংকসমূহের বর্তমান সূদের হার ১৬%-১৮% হ’তে হরাস করে ন্যূনতম ৫% বা তার নিচে নামিয়ে আনা না হ’লে তাদের লোকসান দিতে হবে, এমনকি কারখানা বন্ধ করে দিতে হ’তে পারে। অন্যান্য শিল্প-কারখানা মালিকেরাও অনুরূপ দাবী তুলেছে। দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক বাংলাদেশ ব্যাংক বাধ্য হয়েই বাণিজ্যিক ব্যাংকসমূহের বর্তমান সূদের হারকে যৌক্তিক পর্যায়ে নামিয়ে আনতে দিকনির্দেশনা দিয়েছে। (দ্রষ্টব্য: দৈনিক সংগ্রাম, ২১ ফেব্রুয়ারী ২০০৮)। কারণ শিল্প কারখানা বন্ধ হয়ে গেলে শুধু বৈদেশিক মুদ্রা উপার্জনই বন্ধ হবে না, লক্ষ লক্ষ শ্রমিকও বেকার হবে, সরকার হারাবে বিপুল রাজস্ব। সমগ্র অর্থনীতিতে যার নেতিবাচক প্রভাব পড়বে অনিবার্যভাবেই। একই সঙ্গে ব্যাংকেও অলস টাকার পাহাড় জমবে। তাছাড়া ধনবণ্টন, বিশেষতঃ মুনাফা ও মজুরীর ক্ষেত্রে সূদের নেতিবাচক প্রভাবের কারণে এবং বিত্তশালীদেরই সূদের ভিত্তিতে বৃহৎ আকারের ঋণ প্রাপ্তির সুযোগের ফলে অনিবার্যভাবেই ধনবণ্টনে অসমতা সৃষ্টি হয়। বলাবাহুল্য, সূদ শুধু অর্থনৈতিক সাম্যেরই বিরোধী নয়, সামাজিক সম্প্রীতিরও বিরোধী।

২২। সূদ মুদ্রাস্ফীতিতে প্রত্যক্ষ ইন্ধন যোগায় :

অর্থনীতিতে মুদ্রাস্ফীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কারণ সূদ। সূদনির্ভর অর্থনীতিতে সূদের কারণে দ্রব্যমূল্য ক্রমশঃই বৃদ্ধি পায়। সেই সঙ্গে মুদ্রাস্ফীতি যুক্ত হ’লে দ্রব্যমূল্য হয় আরও ঊর্ধ্বমুখী। কিন্তু এর সঙ্গে সঙ্গতি রেখে জনসাধারণের আয় বৃদ্ধি পায় না। ফলে জীবনযাত্রা হয়ে ওঠে দুর্বিষহ। সূদনির্ভর অর্থনীতিতে বাণিজ্যিক ব্যাংক ও বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের আমানতের বিপরীতে বহুগুণিতক ঋণ সৃষ্টি করতে সক্ষম। এসব আর্থিক প্রতিষ্ঠান অধিক হারে উপার্জনের আশায় অর্থাৎ সূদ প্রাপ্তির জন্যে বিপুল পরিমাণে কাগুজে আমানতসৃষ্ট ঋণ দেয়। এক্ষেত্রে বাস্তবে অর্থ না থাকলেও ঋণ গ্রহীতার ক্রয়ক্ষমতা বহুগুণ বেড়ে যায়, যার প্রতিফলন ঘটে দ্রব্যসামগ্রী ও সেবার মূল্যের ক্ষেত্রে। পরিণামে অবধারিতভাবেই মুদ্রাস্ফীতি ঘটে।

উপরন্তু সূদী ব্যাংক গ্যারান্টির ভিত্তিতে অনেক অনুৎপাদনশীল ঋণ, ভোগ্যঋণ ও সরকারের বাজেট ঘাটতি পূরণের জন্য ঋণ দিয়ে থাকে। এসব ঋণের সঙ্গে দ্রব্যসামগ্রী উৎপাদন ও সরবরাহ বৃদ্ধির কোন সংগতি থাকে না। অর্থাৎ, বাজারে অর্থের সরবরাহ বাড়ে কিন্তু তার বিপরীতে পণ্যসামগ্রী ও সেবার যোগান বাড়ে না। ফলশ্রুতিতে অনিবার্যভাবেই সৃষ্টি হয় মুদ্রাস্ফীতির, যা নিয়ন্ত্রণের জন্যে কোন পদক্ষেপই ফলপ্রসূ বা কার্যকর বিবেচিত হয় না। অথচ এই সময়ে ব্যবসায়ীরা বর্ধিত মূল্যে পণ্যসামগ্রী বিক্রি করে প্রচুর মুনাফা লুটে নেয়। ব্যাংকের পক্ষেও বেশী পরিমাণে সূদ আদায়ের সুবিধা হয়। কিন্তু জনগণের, বিশেষতঃ সীমিত আয়ের লোকদের দুর্দশার সীমা-পরিসীমা থাকে না। তাদের জীবন যাপনের মানের অধোগতি হ’তে শুরু করে যা রোধ করা সহজে সম্ভব হয় না। শেষ অবধি জনতার অব্যাহত জোর দাবীর মুখে সরকার যখন সচেতন হয় কিছু একটা করার জন্যে, ততদিনে সর্বনাশ যা হওয়ার তা হয়ে যায়।

২৩। সূদ ক্ষুদ্র বিনিয়োগ প্রকল্প স্বনির্ভর হওয়ার প্রধান প্রতিবন্ধক :

দারিদ্র্য বিমোচন তথা আত্মকর্মসংস্থানের মাধ্যমে স্বনির্ভরতা অর্জনের জন্য বর্তমানে ক্ষুদ্র ঋণ প্রদান বা মাইক্রো ক্রেডিটের ব্যবহার ব্যাপক বিস্তৃতি লাভ করেছে। কিন্তু এই উদ্যোগ প্রকৃত লক্ষ্য হাসিলে ব্যর্থ হয়েছে। কারণ ক্ষুদ্র বিনিয়োগ হ’তে প্রাপ্ত মুনাফার পরিমাণ প্রায়শঃই প্রান্তিক। সেই প্রান্তিক মুনাফাও শূন্য বা ঋণাত্মক হয়ে দাঁড়ায় সূদ পরিশোধ করার বাধ্যবাধকতার ফলে। আত্মকর্মসংস্থানমূলক ক্ষুদ্র প্রকল্পের জন্যে ঋণ নিয়ে সূদসহ মূলধন পরিশোধ করার সময়ে দেখা যায় কঠোর শ্রমের দ্বারা উপার্জিত বর্ধিত আয়ের প্রায় সবটুকুই তুলে দিতে হচ্ছে ঋণদাতা এনজিওর মাঠকর্মীদের হাতে। ফলে ঋণগ্রহীতার হাতে মুনাফা হিসাবে প্রায় কিছুই থাকছে না। অর্থাৎ লাভের গুড় পিঁপড়ায় খেয়ে নিচ্ছে। এজন্যেই উদ্যোক্তার নিজের পুঁজি গড়ে উঠে না। নিজ হ’তেই উদ্যোগ গ্রহণ তার পক্ষে হয়ে দাঁড়ায় প্রায় অসম্ভব। এই সত্যই ফুটে উঠেছে মার্চ ২০১০-এ অনুষ্ঠিত পল্লীকর্ম সহায়ক ফাউন্ডেশনের (PKSF) সেমিনারে। আলোচকদের মতে সূদের হার ন্যূনতম পর্যায়ে নামিয়ে না আনলে স্বনির্ভরতা অর্জনের সম্ভাবনা সুদূরপরাহত।

নিজের পুঁজি গড়ে না উঠলে মূলধনের জন্য পরনির্ভরশীলতা থেকেই যায়। তাকে পুঁজিপতির বা অর্থলগ্নিকারীর শরণাপন্ন হ’তেই হয়। এই সুযোগেরই অপেক্ষায় থাকে ক্ষুদ্র ঋণদাতারা তথা এনজিওগুলো। এরা কখনই আন্তরিকভাবে চায় না যে, ঋণগ্রহীতারা প্রকৃতই স্বনির্ভর হয়ে উঠুক। তাহ’লে সূদ উপার্জনের উর্বর ক্ষেত্রগুলো হাতছাড়া হয়ে যাবে। এজন্যেই এরা লাভ-লোকসানের অংশীদারীভিত্তিক বিনিয়োগ নয়, সূদভিত্তিক ঋণ দিতেই অধিক আগ্রহী। বস্ত্ততঃ দারিদ্র্য বিমোচন নয়, এরা প্রকারান্তরে দারিদ্রে্যর চাষ করছে।

রাজনৈতিক ও আন্তর্জাতিক কুফল

২৪। সূদ বৈদেশিক ঋণের বোঝা বাড়ায় :

উন্নয়নশীল দেশের সরকার প্রায়শঃ শিল্প ও অন্যান্য ভৌত অবকাঠামো বিনির্মাণের জন্য বিদেশ থেকে ঋণ গ্রহণ করে থাকে। ঐসব ঋণ নির্দিষ্ট মেয়াদ শেষে সূদসহ পরিশোধযোগ্য। কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয়, প্রায়ই দেখা যায় ঐসব ঋণ না নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ফেরত দেওয়া যায়, না উপযুক্তভাবে কাজে লাগিয়ে কাঙ্খিত উন্নতি অর্জন করা যায়। ফলে ঋণ পরিশোধ তো দূরের কথা, অনেক সময় শুধু সূদ শোধ দেওয়াই দায় হয়ে ওঠে। এই অবস্থায় পূর্বের ঋণ পরিশোধের জন্য এসব দেশ আবার নতুন করে ঋণ গ্রহণ করে। এই নতুন ঋণ সূদে-আসলে পূর্বের ঋণকে ছাড়িয়ে যায় এবং প্রকৃত প্রস্তাবে সূদ-আসলে সমুদয় ঋণই বোঝা হয়ে চাপে জনগণের কাঁধে।

অনুরূপভাবে দেশে কোন বিপর্যয় বা সংকট দেখা দিলে অথবা খাদ্যশস্যের মতো অপরিহার্য পণ্যের ঘাটতি ঘটলে তা পূরণের জন্য সরকারকে বন্ধু দেশ বা ঋণদানকারী কনসর্টিয়াম থেকে ঋণ নিতে হয়। ভোগের জন্যে গৃহীত এই ঋণের বিপরীতে যেহেতু কোন উৎপাদন বা কর্মসংস্থান হয় না, সেহেতু এই ঋণের আসল পরিশোধ তো দূরের কথা, যথাসময়ে সূদই পরিশোধ করা সম্ভব হয় না। এক্ষেত্রে সরকারকে হয় বাড়তি কর আরোপ করে এই অর্থ জনগণের কাছ থেকেই সংগ্রহ করতে হয়, নয়তো আবারও ঋণ নিতে হয়।

২৫। সূদের কারণেই ধনী ও দরিদ্র দেশের প্রকৃত সম্পর্ক হয় শোষক-শোষিতের :

বর্তমান বিশ্বের দেশগুলোকে প্রধানতঃ দু’টি অভিধায় বিভক্ত করা হয়ে থাকে- ধনী ও দরিদ্র খুব সম্মান রেখে বললে বলা হয় উন্নত ও উন্নয়নশীল। দরিদ্র দেশগুলো সকলেই প্রকৃতপক্ষে দরিদ্র নয়। তাদের রয়েছে পর্যাপ্ত মানব সম্পদ ও প্রাকৃতিক সম্পদ। কিন্তু এই দুই সম্পদ কাজে লাগাবার জন্য তাদের যেমন নেই আধুনিক প্রযুক্তি তেমনি নেই পর্যাপ্ত অর্থ। এই সুযোগটাই কাজে লাগাতে চেষ্টা করে ধনী দেশগুলো। পৃথকভাবে কোন একটি দেশ নয়, বরং ইউরোপের ধনী দেশগুলোর আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (IMF), মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্বব্যাংক এবং এশিয়ার ধনী দেশগুলোর এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক জোটবদ্ধভাবে প্রাকৃতিক সম্পদশালী কিন্তু আপাতঃ দরিদ্র দেশগুলোকে তাদের হাতের মুঠোয় রাখতে বদ্ধপরিকর। সেজন্যে এদের কৌশলের অন্ত নেই। এদের প্রধান কাজ হ’ল বিশেষজ্ঞ পরামর্শকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়ে বিশাল বিশাল প্রকল্প তৈরী ও গ্রহণ করিয়ে আর্থিক সহযোগিতার নামে চড়া সূদে বিপুল পরিমাণ ঋণ গ্রহণে প্ররোচিত করা এবং দীর্ঘমেয়াদে শোষণ করা। ছলে-বলে-কৌশলে তারা এই কাজটা অব্যাহতভাবে করে চলেছে।

একবার ঋণের ফাঁদ এসব দেশের গলায় পরাতে পারলে তাদের মতলব হাসিল হয়ে যায়। তখন যেমন রাজনৈতিকভাবে এদেরকে চাপে রাখা যায়, তেমনি অর্থনৈতিকভাবে এসব দেশকে শোষণের পথও সুগম হয়ে যায়। এই শোষণ যেমন দীর্ঘমেয়াদী তেমনি এর প্রকৃতিও ভয়াবহ। শুধু গৃহীত ঋণের সূদ বাবদ তখন প্রতি বছর হাযার কোটি টাকার উপর পরিশোধ করতে হয়। বাংলাদেশ গত ২০০৮-০৯ অর্থ বছরে সূদ বাবদই পরিশোধ করেছে বাংলাদেশী মুদ্রায় ১৩১১ কোটি টাকা। (সূত্র : বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সমীক্ষা, ২০০৯; পৃ. ২৫১, অর্থ বিভাগ, অর্থ মন্ত্রণালয়, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার)। ফলশ্রুতিতে সংশ্লিষ্ট দেশের গুরুত্বপূর্ণ সব প্রতিষ্ঠান যেমন রাজনৈতিক দল, সাহিত্য সংস্কৃতি ও জ্ঞানচর্চার কেন্দ্র, বৈজ্ঞানিক গবেষণাগার, সংবাদপত্র, পার্লামেন্ট এমনকি ধর্মচর্চার কেন্দ্রগুলোও ক্রমেই ঋণদাতা দেশগুলোর কর্তৃত্বের আওতায় চলে আসে। পুঁজিপতিরা যেভাবে চায় সে ধরনের সরকারই এসব দেশে প্রতিষ্ঠিত হয় এবং সেই সরকারের যাবতীয় পলিসিও তাদের দ্বারাই নিয়ন্ত্রিত হয়। দেশের দারিদ্র্য বিমোচনের জন্য এরাই কৌশলপত্র তৈরীর নির্দেশ দেয় এবং সেই কৌশলপত্রও (Poverty Reduction Strategy Paper) এদের তত্ত্বাবধানেই তৈরী হয়, যার গূঢ় উদ্দেশ্য দারিদ্র্য বিমোচন নয়; বরং দারিদ্রে্যর প্রসার, তৃণমূল পর্যায়ের মানুষদের আরও বেশী পরমুখাপেক্ষী করে তোলা।

উন্নত ধনী দেশগুলোর সাথে দরিদ্র দেশগুলোর বৈষম্য যে ক্রমেই বৃদ্ধি পাচ্ছে তার অন্যতম প্রধান কারণ সূদী ঋণ ব্যবস্থা। সূদভিত্তিক বৈদেশিক ঋণ দুনিয়ার দরিদ্র দেশগুলোর জন্য অপূরণীয় ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। উন্নত দেশগুলোর সূদভিত্তিক ঋণ আজ আন্তর্জাতিক শোষণের মুখ্য হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে, যা সাম্রাজ্যবাদেরই আরেক নতুন রূপ। এরই কারণে ধনী ও দরিদ্র দেশগুলোর সম্পর্কের ক্ষেত্রে নতুন মাত্রা যোগ হয়েছে। এ সম্পর্কে এখন কার্যতঃ শোষক ও শোষিতের।

মুনাফিকী থেকে বাঁচার পথ

https://i0.wp.com/www.waytojannah.com/wp-content/uploads/2016/02/6926894-dark-flame-hd1111.jpg

একজন মুসলিম নিজকে মুনাফিকী থেকে পূতপবিত্র রাখতে চাইলে তাকে অবশ্যই সদগুণাবলী ও সৎকর্মে বিভূষিত হ’তে হবে। নিম্নে এ বিষয়ে আলোচনা তুলে ধরা হ’ল :

১. ছালাতের জামা‘আতে আগেভাগে হাযির হওয়া এবং তাকবীরে তাহরীমা পাওয়া :

আনাস ইবনু মালিক (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন,

مَنْ صَلَّى لِلَّهِ أَرْبَعِيْنَ يَوْمًا فِى جَمَاعَةٍ يُدْرِكُ التَّكْبِيْرَةَ الأُوْلَى كُتِبَتْ لَهُ بَرَاءَتَانِ بَرَاءَةٌ مِنَ النَّارِ وَبَرَاءَةٌ مِنَ النِّفَاقِ.

‘যে ব্যক্তি প্রথম তাকবীর প্রাপ্তিসহ একাধারে চল্লিশ দিন (পাঁচ ওয়াক্ত ছালাত) জামা‘আতে আদায় করবে তার জন্য দু’টি মুক্তিপত্র লিখে দেওয়া হবে। একটি জাহান্নাম থেকে মুক্তি, দ্বিতীয়টি মুনাফিকী থেকে মুক্তি’।[14]

জাহান্নাম থেকে মুক্তি (براءة من النار) অর্থ জাহান্নাম থেকে নিষ্কৃতি লাভ করবে। যেমন বলা হয়, بَرَأَ مِنَ الدِّيْنِ وَالْعَيْبِ : خَلَصَ ‘অমুক ঋণ ও দোষ থেকে মুক্তি পেয়েছে; অর্থাৎ খালাস পেয়েছে। দোষ থেকে তার মুক্তি মিলেছে অর্থাৎ নির্দোষ সাব্যস্ত হয়েছে। নিফাক থেকে মুক্তি মেলা (براءة من النفاق) প্রসঙ্গে আল্লামা তিবী বলেছেন, ঐ লোকটি তার ছালাতের বদৌলতে দুনিয়াতে মুনাফিকের মত আমল করা থেকে নিরাপদ থাকবে এবং একনিষ্ঠ মুখলিছের মত আমল করার তাওফীক লাভ করবে। আর আখিরাতে সে মুনাফিকের জন্য বরাদ্দ শাস্তি থেকে নিরাপদে থাকবে। সে যে মুনাফিক ছিল না তৎসম্পর্কে সাক্ষ্য দেওয়া হবে। অর্থাৎ বলা হবে মুনাফিকরা যখন ছালাতে দাঁড়াত তখন আলসেমি করত। কিন্তু এই লোকটা ছিল তাদের বিপরীত। মিরকাত গ্রন্থে এমনটাই বলা হয়েছে।[15]

২. সদাচার ও দ্বীন সম্পর্কে জ্ঞান লাভ :

عَنْ أَبِىْ هُرَيْرَةَ قَالَ قَالَ رَسُوْلُ اللهِ صلى الله عليه وسلم خَصْلَتَانِ لاَ تَجْتَمِعَانِ فِىْ مُنَافِقٍ حُسْنُ سَمْتٍ وَلاَ فِقْهٌ فِى الدِّيْنِ-

আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন, ‘দু’টি আচার কোন মুনাফিকের মধ্যে মেলে না- সদাচার ও দ্বীন সম্পর্কিত জ্ঞান’।[16]

হাদীছটিতে উদ্ধৃত حُسْنُ سَمْتٍ অর্থ কল্যাণের পথের অনুসন্ধান এবং নেককার লোকদের গুণে গুণান্বিত হওয়া, সেই সঙ্গে প্রকাশ্য অপ্রকাশ্য সবরকম দোষ থেকে দূরে থাকা। وَلاَ فِقْهٌ فِى الدِّيْنِ বাক্যটি لاَ অব্যয় যোগে পূর্বের বাক্যের সাথে সংযুক্ত হয়েছে। কেননা حُسْنُ سَمْتٍ বাক্যাংশটি নেতিবাচক অর্থের অঙ্গীভূত। এজন্যই وَلاَ فِقْهٌ فِى الدِّيْنِ বাক্যাংশেও لاَ বা নাবাচক অব্যয়টি আগের নাবাচকতাকে জোরদার করেছে মাত্র।[17]

৩. দানশীলতা :

عَنْ أَبِىْ مَالِكٍ الأَشْعَرِىِّ قَالَ قَالَ رَسُوْلُ اللهِ صلى الله عليه وسلم الطُّهُوْرُ شَطْرُ الإِيْمَانِ وَالْحَمْدُ لِلَّهِ تَمْلأُ الْمِيْزَانَ، وَسُبْحَانَ اللهِ وَالْحَمْدُ لِلَّهِ تَمْلآنِ أَوْ تَمْلأُ مَا بَيْنَ السَّمَاوَاتِ وَالأَرْضِ وَالصَّلاَةُ نُوْرٌ وَالصَّدَقَةُ بُرْهَانٌ وَالصَّبْرُ ضِيَاءٌ وَالْقُرْآنُ حُجَّةٌ لَكَ أَوْ عَلَيْكَ، كُلُّ النَّاسِ يَغْدُو فَبَائِعٌ نَفْسَهُ فَمُعْتِقُهَا أَوْ مُوْبِقُهَا.

আবু মালিক আল-আশ‘আরী (রাঃ) হ’তে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন, ‘পবিত্রতা ঈমানের অর্ধেক। একবার আল-হামদুলিল্লাহ উচ্চারণে দাঁড়িপাল্লা (ছওয়াবে) ভরে যায়; আর সুবহানাল্লাহ এবং আল-হামদুলিল্লাহ বলায় আসমান ও যমীনের মধ্যবর্তী সমুদয় স্থান (ছওয়াবে) ভরে যায়। (মানুষের জন্য) ছালাত হ’ল আলো, দান হ’ল প্রমাণ এবং ধৈর্য হ’ল জ্যোতি। আর কুরআন মাজীদ (ক্বিয়ামতে) হয় তোমার পক্ষে প্রমাণ হয়ে দাঁড়াবে অথবা তোমার বিরুদ্ধে। ভোর বেলায় (ঘুম থেকে জাগরণের মাধ্যমে) প্রত্যেকটা মানুষ নিজেকে (আমলের নিকট) বেঁচে দেয়। তারপর ভাল আমলের মাধ্যমে হয় সে নিজকে মুক্ত করে অথবা খারাপ আমলের মাধ্যমে নিজকে ধ্বংস করে’।[18]

ইমাম নববী (রহঃ) বলেছেন, দান-ছাদাক্বা দাতার ঈমানের প্রমাণ। কেননা মুনাফিক দান-ছাদাক্বা থেকে হাত গুটিয়ে রাখে, সে দান-ছাদাক্বায় বিশবাসী নয়। সুতরাং যে দান করে সে তার দানের মাধ্যমে তার ঈমানের সত্যতা জ্ঞাপন করে।[19]

৪. রাত জেগে ছালাত আদায় :

কাতাদা (রহঃ) বলেন, মুনাফিক খুব কমই রাত জাগে (قلما ساهر الليل منافق)।[20] তার কারণ মুনাফিকরা লোকদের দেখিয়ে দেখিয়ে সৎকাজ করতে আনন্দ পায়। নিরিবিলি থাকাকালে তাই সে সৎ কাজ করার উদ্দীপনা অনুভব করে না। সুতরাং কোন ব্যক্তি যখন রাত জেগে ছালাত আদায় করে, তখন তা তার মুনাফিক না হওয়ার এবং সত্য মুমিন হওয়ার প্রমাণ বহন করে।

৫. আল্লাহর পথে জিহাদ :

আবু হুরায়রা (রাঃ) হ’তে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন,

مَنْ مَاتَ وَلَمْ يَغْزُ وَلَمْ يُحَدِّثْ بِهِ نَفْسَهُ مَاتَ عَلَى شُعْبَةٍ مِنْ نِّفَاقٍ

‘যে ব্যক্তি যুদ্ধ-জিহাদ না করে অথবা নিজের মনে যুদ্ধ-জিহাদের সংকল্প না করে মারা যাবে, সে মুনাফিকীর একটি শাখার উপর মারা যাবে’।[21]

ইমাম নববী বলেছেন, মুনাফিকরা যুদ্ধে যোগদান না করে বাড়ি বসে থাকে। তাই যে উক্ত হাদীছ মত কাজ করবে সে মুনাফিকদের সদৃশ হয়ে যাবে। কেননা জিহাদ তরক করা মুনাফিকীর একটি শাখা বা পর্যায়। এ হাদীছ থেকে একথাও প্রমাণিত হয় যে, যে ব্যক্তি কোন কাজের নিয়ত বা ইচ্ছা করল কিন্তু তা করার আগেই সে মারা গেল, তার ক্ষেত্রে ঐ নিন্দা-সাজা প্রযোজ্য হবে না যা সেই কাজের নিয়ত না করেই মৃত্যুবরণকারীর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য।[22]

৬. বেশী বেশী আল্লাহর যিকির করা :

আল্লামা ইবনুল ক্বাইয়িম (রহঃ) বলেছেন, আল্লাহ তা‘আলার কথা বেশী বেশী স্মরণ করলে মুনাফিকী থেকে মুক্তি মেলে। কেননা মুনাফিকরা আল্লাহকে কম স্মরণ করে। আল্লাহ তা‘আলা মুনাফিকদের এহেন আচরণ সম্পর্কে বলেছেন, وَلاَ يَذْكُرُوْنَ اللهَ إِلاَّ قَلِيْلاً ‘তারা আল্লাহকে অল্পই স্মরণ করে’ (নিসা ৪/১৪২)।

কা‘ব (রাঃ) বলেছেন, যে আল্লাহকে বেশী বেশী স্মরণ করে সে মুনাফিকী থেকে মুক্ত হয়ে যায়। এজন্যই আল্লাহ তা‘আলা সূরা আল-মুনাফিকূন-এর উপসংহার টানতে গিয়ে বলেছেন,

يَا أَيُّهَا الَّذِيْنَ آمَنُوا لاَ تُلْهِكُمْ أَمْوَالُكُمْ وَلاَ أَوْلاَدُكُمْ عَنْ ذِكْرِ اللهِ وَمَنْ يَّفْعَلْ ذَلِكَ فَأُوْلَئِكَ هُمُ الْخَاسِرُوْنَ-

‘হে ঈমানদারগণ! তোমাদের ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি যেন তোমাদেরকে আল্লাহর যিকির/স্মরণ থেকে অমনোযোগী করে না দেয়। আর যারাই এমনটা করবে তারাই হবে ক্ষতিগ্রস্ত’ (মুনাফিকূন ৬৩/৯)।

মুনাফিকরা আল্লাহর স্মরণ সম্পর্কে উদাসীন বনে যাওয়ার কারণে মুনাফিকীর খপ্পরে পড়েছিল। তাই এ আয়াতে আল্লাহ তা‘আলা ঈমানদারদের যিকির থেকে উদাসীন বা বেখেয়াল হওয়া সম্পর্কে সতর্ক করেছেন।

জনৈক ছাহাবীকে খারেজীরা মুনাফিক কি-না জিজ্ঞেস করা হ’লে, তিনি বললেন, ‘না, তারা মুনাফিক নয়; কেননা মুনাফিকরা আল্লাহকে খুব অল্পই স্মরণ করে’। সুতরাং অল্প-স্বল্প যিকর মুনাফিকীর চিহ্ন ও প্রতীক এবং বেশী বেশী যিকরে মুনাফিকীর খপ্পরে পড়া থেকে মুক্তি পাওয়া যায়। যিকররত অন্তরকে আল্লাহ তা‘আলা মুনাফিকীর পরীক্ষার মুখোমুখি করেন না, এ পরীক্ষা কেবল তাদের জন্য যারা আল্লাহ তা‘আলার যিকরে উদাসীন।[23]

৭. দো‘আ :

জুবায়ের ইবনু নুফায়ের (রাঃ) হ’তে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি সিরিয়ার হিমছ শহরে আবুদ দারদা (রাঃ)-এর বাড়িতে তাঁর সাথে দেখা করতে গেলাম। আমি যখন সেখানে পৌঁছলাম তখন দেখলাম, তিনি তাঁর ছালাতের জায়গায় দাঁড়িয়ে ছালাত আদায় করছেন। যখন তিনি বসে আত্তাহিয়্যাতু পড়া শেষ করলেন তখন মুনাফিকী থেকে আল্লাহর আশ্রয় প্রার্থনা করতে লাগলেন। তাঁর ছালাত শেষ হ’লে আমি বললাম, হে আবুদ দারদা আল্লাহ আপনাকে ক্ষমা করুন! মুনাফিকী নিয়ে আপনার ভাবনা কেন? তিনি অবাক সুরে বললেন, আল্লাহ মাফ কর! আল্লাহ মাফ কর! আল্লাহ মাফ কর! বালা-মুছীবতের হাত থেকে কে নিশ্চিন্ত থাকতে পারে? বালা-মুছীবতের হাত থেকে কে নিশ্চিন্ত থাকতে পারে? আল্লাহর কসম! একজন মানুষ মুহূর্তের মধ্যে বিপদে পড়তে পারে এবং সেজন্যে তার দ্বীন-ধর্মও ত্যাগ করতে পারে।[24]

৮. আনছারদের ভালবাসা :

আনাস (রাঃ) হ’তে বর্ণিত, নবী করীম (ছাঃ) বলেছেন,

آيَةُ الإِيْمَانِ حُبُّ الأَنْصَارِ، وَآيَةُ النِّفَاقِ بُغْضُ الأَنْصَارِ

‘ঈমানের নিদর্শন আনছারদের প্রতি ভালবাসা এবং মুনাফিকীর নিদর্শন আনছারদের প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করা’।[25]

৯. আলী ইবনু আবু তালিব (রাঃ)-কে ভালবাসা :

যির (রাঃ) হ’তে বর্ণিত, তিনি বলেন, আলী ইবনু আবু তালিব (রাঃ) বলেছেন,

وَالَّذِى فَلَقَ الْحَبَّةَ وَبَرَأَ النَّسَمَةَ إِنَّهُ لَعَهْدُ النَّبِىِّ الأُمِّىِّ صلى الله عليه وسلم إِلَىَّ أَنَّهُ لاَ يُحِبُّنِى إِلاَّ مُؤْمِنٌ وَلاَ يُبْغِضُنِى إِلاَّ مُنَافِقٌ

‘যে মহান সত্তা ফসল উদগত করেন এবং জীবকে অস্তিতবহীন অবস্থা থেকে অস্তিত্ব দান করেন তাঁর কসম! আমার সপক্ষে নিরক্ষর নবী (ছাঃ)-এর অছিয়ত রয়েছে যে, মুমিন ছাড়া আমাকে কেউ ভালবাসবে না এবং মুনাফিক ছাড়া কেউ আমার প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করবে না’।[26]

মুনাফিকদের মুকাবেলায় মুসলমানদের ভূমিকা :

মুনাফিকদের ক্ষেত্রে কোন ঢিলেমি না করা ফরয। তাদের পক্ষ থেকে আগত বিপদকে খাট করে দেখাও বৈধ নয়। বর্তমানে মুনাফিকরা তো নবী করীম (ছাঃ)-এর যুগ থেকে বেশী বিপজ্জনক হয়ে উঠেছে। হুযাইফা ইবনুল ইয়ামান (রাঃ) হ’তে বর্ণিত তিনি বলেন, মুনাফিকরা আজ নবী করীম (ছাঃ)-এর যুগের থেকেও ভয়ানক হয়ে দাঁড়িয়েছে। সেদিন তারা লুকিয়ে ছাপিয়ে মুনাফিকী করত। কিন্তু আজ প্রকাশ্যে বুক ফুলিয়ে তা করছে’।[27] তাদের বিষয়ে মুসলমানদের ভূমিকা হবে নিম্নরূপ :

১. তাদের আনুগত্য না করা :

আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

يَا أَيُّهَا النَّبِيُّ اتَّقِ اللهَ وَلَا تُطِعِ الْكَافِرِيْنَ وَالْمُنَافِقِيْنَ إِنَّ اللهَ كَانَ عَلِيْماً حَكِيْماً.

‘হে নবী, আল্লাহকে ভয় কর এবং কাফির ও মুনাফিকদের আনুগত্য কর না। অবশ্যই আল্লাহ সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়’ (আহযাব ৩৩/১)।

ইমাম তাবারী (রহঃ) বলেন, আল্লাহ তা‘আলা তাঁর নবীকে সম্বোধন করে বলেছেন, হে নবী, তুমি আল্লাহ তা‘আলার আনুগত্য এবং তাঁর প্রতি তোমার দায়িত্ব ও কর্তব্য পালনের মাধ্যমে তাঁকে ভয় কর। আর তাঁকে ভয় কর, তাঁর নির্দেশিত হারাম থেকে দূরে থাকা ও তার সীমালংঘন না করার মাধ্যমে। আর তুমি ঐ সকল কাফিরের আনুগত্য করবে না যারা তোমাকে বলে, তোমার যেসব ছোট লোক ঈমানদার অনুসারী আছে তোমার নিকট থেকে তাদের হটিয়ে দাও, যাতে আমরা তোমার কাছে বসতে পারি’। তুমি ঐ সকল মুনাফিকেরও আনুগত্য করবে না যারা দৃশ্যত তোমার উপর ঈমান রাখে এবং তোমার কল্যাণ কামনা করে, কিন্তু ভিতরে ভিতরে তোমার, তোমার দ্বীন এবং তোমার ছাহাবীদের ক্ষতি করতে মোটেও কোন সুযোগ হাতছাড়া করবে না। তুমি তাদের কোন মতামত গ্রহণ করবে না এবং শুভাকাঙ্খী মনে করে তাদের কাছে কোন পরামর্শও চাইতে যাবে না। কারণ তারা তোমার শত্রু। ঐ সমস্ত মুনাফিকের অন্তরে কী লুক্কায়িত আছে আর কী উদ্দেশ্যেই বা তারা বাহ্যত তোমার কল্যাণ কামনা যাহির করছে তা তাঁর ভাল জানা আছে। তিনি তোমার, তোমার দ্বীনের এবং তোমার ছাহাবীদের সহ সমগ্র সৃষ্টির ব্যবস্থাপনায় মহাপ্রজ্ঞার অধিকারী।[28]

২. মুনাফিকদের উপেক্ষা করা, ভীতি প্রদর্শন ও উপদেশ দান

আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

بَشِّرِ الْمُنَافِقِيْنَ بِأَنَّ لَهُمْ عَذَاباً أَلِيْماً

‘তুমি মুনাফিকদের এই সংবাদ জানিয়ে দাও যে, তাদের জন্য রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি’ (নিসা ৪/১৩৮)।

তিনি আরো বলেন,

أُولَـئِكَ الَّذِيْنَ يَعْلَمُ اللهُ مَا فِيْ قُلُوْبِهِمْ فَأَعْرِضْ عَنْهُمْ وَعِظْهُمْ وَقُل لَّهُمْ فِي أَنفُسِهِمْ قَوْلاً بَلِيْغاً .

‘ঐ মুনাফিকরাই তো তারা, যাদের অন্তরে কী আছে আল্লাহ তা জানেন। সুতরাং তুমি ওদের এড়িয়ে চল বা উপেক্ষা কর, ওদের উপদেশ দাও এবং ওদের এমন কথা যা মর্মে গিয়ে পৌঁছে’ (নিসা ৪/৬৩)।

আল্লাহ তা‘আলা আয়াতে ‘ওরা’ (اولئك) বলতে মুনাফিকদের বুঝিয়েছেন, ইতিপূর্বে যাদের বর্ণনা তুলে ধরা হয়েছে। তিনি বলেন, হে রাসূল! তাগূতের কাছে তাদের বিচার প্রার্থনা করা, তোমার কাছে বিচার প্রার্থনা না করা এবং তোমার কাছে আসতে বাধা দানে তাদের মনে কী অভিপ্রায় লুকিয়ে ছিল তা আল্লাহ খুব ভাল জানেন। তাদের মনে তো মুনাফিকী ও বক্রতা লুকিয়ে রয়েছে যদিও তারা শপথ করে বলে, আমরা কেবলই কল্যাণ ও সম্প্রীতি কামনা করি।

আল্লাহ তা‘আলা তাঁর রাসূলকে বলছেন, ‘তুমি ওদের ছাড় দাও, কায়িক-দৈহিক কোন শাস্তি তুমি ওদের দেবে না। তবে তুমি তাদের উপর আল্লাহর শাস্তি চেপে বসার এবং তাদের বসতিতে আল্লাহর মার অবতীর্ণ হওয়া সম্পর্কে তাদেরকে ভয় দেখিয়ে উপদেশ দাও। তারা আল্লাহ ও তার রাসূল সম্পর্কে যে সন্দেহের দোলাচলে ঘুরপাক খাচ্ছে। সেজন্য যে অপ্রীতিকর অবস্থার মুখোমুখি তারা হবে সে সম্পর্কে তাদের সতর্ক কর। আর তাদের হুকুম কর আল্লাহকে ভয় করতে এবং আল্লাহ, আল্লাহর রাসূল, আল্লাহর প্রতিশ্রুতি ও শাস্তিকে সত্য বলে মেনে নিতে’।[29]

৩. মুনাফিকদের সঙ্গে বিতর্কে না জড়ানো :

আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

وَلاَ تُجَادِلْ عَنِ الَّذِيْنَ يَخْتَانُوْنَ أَنْفُسَهُمْ إِنَّ اللهَ لاَ يُحِبُّ مَن كَانَ خَوَّاناً أَثِيْماً.

‘যারা নিজেদের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করে, তুমি তাদের পক্ষে বিতর্কে লিপ্ত হবে না। নিশ্চয়ই আল্লাহ কখনো বিশ্বাসঘাতক পাপিষ্ঠকে পসন্দ করেন না’ (নিসা ৪/১০৭)।

আল্লাহ বলেছেন, হে রাসূল! যারা নিজেদের সাথে খিয়ানত তথা বিশ্বাসঘাতকতা করে তাদের পক্ষ নিয়ে তুমি বিতর্ক করবে না। বনু উবাইরিক গোত্রের কিছু লোক এই বিশ্বাসঘাতকতা করেছিল। যাফর গোত্রের তাম‘আহ বা বশীর ইবনু উবাইরিক এক আনছারীর বর্ম চুরি করে। বর্মের মালিক নবী করীম (ছাঃ)-এর কাছে অভিযোগ করে এবং তাম‘আহর প্রতি তার সন্দেহের কথা বলে। অনুসন্ধান শুরু হ’লে সে বর্মটি এক ইহুদীর কাছে গচ্ছিত রাখে। পরে তাম‘আহ, তার ভাই-বেরাদার ও বনু যাফরের আরো কিছু লোক জোট পাকিয়ে সেই ইহুদীর বিরুদ্ধে অভিযোগ আনে। ইহুদীকে জিজ্ঞেস করা হ’লে সে নিজেকে নির্দোষ দাবী করে। কিন্তু তাম‘আহর লোকেরা জোরেশোরে বলতে থাকে, এতো শয়তান ইহুদী, সেতো আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে অস্বীকার করে। তার কথা কেমন করে বিশ্বাসযোগ্য হ’তে পারে? বরং আমাদের কথা মেনে নেওয়া উচিত। কেননা আমরা মুসলমান। এ মোকদ্দমার বাহ্যিক ধারাবিবরণীতে প্রভাবিত হয়ে নবী করীম (ছাঃ) ঐ ইহুদীর বিরুদ্ধে রায় দিতে এবং অভিযোগকারীকে বনু উবাইরিকের বিরুদ্ধে দোষারোপ করার জন্য সতর্ক করে দিতে প্রায় উদ্যত হয়েছিলেন। এমন সময় উক্ত আয়াত নাযিল হয় এবং সমস্ত ব্যাপারটির প্রকৃত সত্য উদঘাটিত হয়।

আসলে যে ব্যক্তি অন্যের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করে সে সবার আগে নিজের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করে। কারণ মন ও মস্তিষ্কের শক্তিগুলো তার কাছে আমানত হিসাবে গচ্ছিত রাখা হয়েছে। সে সেগুলোকে অযথা ব্যবহার করে তাদেরকে বিশ্বাসঘাতকতা করতে বাধ্য করে। বিবেক-বুদ্ধিকে দ্বীনের অনুগত না করে বরং আপন খেয়ালখুশির অনুগত করে সে এভাবে নিজের সাথে খিয়ানত ও বিশ্বাসঘাতকতা করে।

তাই এমন বিশ্বাসঘাতকদের পক্ষ নিতে নবী করীম (ছাঃ)-কে নিষেধ করা হয়েছে। বস্ত্তত মানুষের সম্পদ আত্মসাৎ করা যাদের স্বভাব এবং এরূপ আত্মসাৎ ও অন্যান্য হারামের মাঝে বিচরণের মাধ্যমে যারা পাপ-পঙ্কিলতার মাঝে ডুবে থাকে, আল্লাহ তা‘আলা তাদেরকে মোটেও ভালবাসেন না এবং পসন্দও করেন না।[30]

৪. মুনাফিকদের সাথে বন্ধুত্ব গড়ে না তোলা :

আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

يَا أَيُّهَا الَّذِيْنَ آمَنُوْا لاَ تَتَّخِذُوْا بِطَانَةً مِّنْ دُوْنِكُمْ لاَ يَأْلُوْنَكُمْ خَبَالاً وَدُّوْا مَا عَنِتُّمْ قَدْ بَدَتِ الْبَغْضَاءُ مِنْ أَفْوَاهِهِمْ وَمَا تُخْفِي صُدُوْرُهُمْ أَكْبَرُ قَدْ بَيَّنَّا لَكُمُ الآيَاتِ إِنْ كُنتُمْ تَعْقِلُوْنَ.

‘হে মুসলিগণ! তোমরা মুমিন ব্যতীত অন্য কাউকে অন্তরঙ্গরূপে গ্রহণ করো না; তারা তোমাদের অমঙ্গল সাধনে কোন ত্রুটি করে না- তোমরা কষ্টে থাক, তাতেই তাদের আনন্দ। শত্রুতাপ্রসূত বিদ্বেষ তাদের মুখেই ফুটে বেরোয়। আর যা কিছু তাদের মনে লুকিয়ে রয়েছে, তা আরো অনেকগুণ বেশী জঘন্য। তোমাদের জন্যে নিদর্শন বিশদভাবে বর্ণনা করে দেয়া হলো, যদি তোমরা তা অনুধাবন করতে সমর্থ হও’ (আলে ইমরান ৩/১১৮)।

উক্ত আয়াত কিছু মুসলিম সম্পর্কে নাযিল হয়েছে। তারা তাদের ইহুদী মুনাফিক বন্ধুদের সঙ্গে গভীর মিতালি রাখত এবং প্রাক ইসলামী যুগে জাহেলিয়াতের যামানায় যেসব কারণে তাদের মাঝে বন্ধুত্ব গড়ে উঠেছিল ইসলাম পরবর্তীকালেও তারা তা নির্ভেজালভাবে অটুট রেখেছিল। আল্লাহ তা‘আলা এ আয়াতে তাদেরকে এমন বন্ধুত্ব রক্ষা করতে নিষেধ করেন এবং একই সাথে তাদের কোন কাজে ওদের থেকে পরামর্শ নিতেও নিষেধ করে দেন’।[31]

৫. মুনাফিকদের বিরুদ্ধে জিহাদ চালনা এবং কঠোরতা আরোপ :

আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

يَا أَيُّهَا النَّبِيُّ جَاهِدِ الْكُفَّارَ وَالْمُنَافِقِيْنَ وَاغْلُظْ عَلَيْهِمْ وَمَأْوَاهُمْ جَهَنَّمُ وَبِئْسَ الْمَصِيْرُ.

‘হে নবী! তুমি কাফির ও মুনাফিকদের বিরুদ্ধে জিহাদ চালিয়ে যাও এবং তাদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান গ্রহণ কর। তাদের বাসস্থান হবে জাহান্নাম। আর তা কতই না নিকৃষ্ট আবাস’! (তওবা ৯/৭৩)।

মুনাফিকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ও ভয় দেখানোর মাধ্যমে এই কঠোর অবস্থান নিশ্চিত করা যায়।

৬. মুনাফিকদের প্রতি অবজ্ঞা দেখান এবং তাদের নেতা না বানানো :

عَنْ بُرَيْدَةَ قَالَ قَالَ رَسُولُ اللهِ صلى الله عليه وسلم لاَ تَقُولُوْا لِلْمُنَافِقِ سَيِّدٌ فَإِنَّهُ إِنْ يَكُ سَيِّدًا فَقَدْ أَسْخَطْتُمْ رَبَّكُمْ عَزَّ وَجَلَّ.

বুরাইদা (রাঃ) হ’তে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন, ‘তোমরা কোন মুনাফিককে সাইয়্যিদ বা নেতা নামে আখ্যায়িত করো না। কেননা সে যদি সত্যিই (তোমাদের) নেতা হয়, তাহ’লে তোমরা তোমাদের প্রভুকে ক্ষুব্ধ করবে’।[32]

৭. মুনাফিকদের জানাযার ছালাতে অংশগ্রহণ না করা :

আল্লাহ তা‘আরা বলেন,

وَلاَ تُصَلِّ عَلَى أَحَدٍ مِّنْهُم مَّاتَ أَبَداً وَلاَ تَقُمْ عَلَىَ قَبْرِهِ إِنَّهُمْ كَفَرُواْ بِاللهِ وَرَسُوْلِهِ وَمَاتُوْا وَهُمْ فَاسِقُوْنَ.

‘তাদের (মুনাফিকদের) কেউ মারা গেলে তুমি কখনও তার জানাযার ছালাত আদায় করবে না এবং তার কবরের পাশে দাঁড়াবে না। নিশ্চয়ই তারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের সাথে কুফরী করেছে এবং পাপাচারী অবস্থাতেই তাদের মৃত্যু হয়েছে’ (তওবা ৯/৮৪)।

এই আয়াতের শানে নুযূল সম্পর্কে আব্দুল্লাহ ইবনু মাসঊদ (রাঃ) হ’তে বর্ণিত আছে যে, যখন মুনাফিকদের দলপতি আব্দুল্লাহ ইবনু উবাই মারা যায় তখন তার পুত্র আব্দুল্লাহ নবী করীম (ছাঃ)-এর নিকট এসে বললেন, হে আল্লাহর রাসূল (ছাঃ)! আপনার জামাটা আমাকে দিন, ওটা দিয়ে আমি ওকে কাফন দেব। আর আপনি ওর জানাযার ছালাত আদায় করবেন এবং ওর জন্য ক্ষমা চাইবেন। তিনি তাকে জামাটা দিয়ে বললেন, কাফন জড়ান শেষ হ’লে আমাকে জানাবে। তিনি কাফন সম্পন্ন করে তাঁকে জানালেন। তিনি তখন জানাযার ছালাতে ইমামতির জন্য এগিয়ে গেলেন। কিন্তু সে সময় ওমর (রাঃ) তাঁকে টেনে ধরলেন এবং বললেন, আল্লাহ কি আপনাকে মুনাফিকদের জানাযার ছালাত আদায় করতে নিষেধ করেননি? তিনি কি বলেননি, তুমি তাদের জন্য মাফ চাও কিংবা না চাও সবই সমান। তুমি যদি তাদের জন্য সত্তর বারও ক্ষমা চাও তবুও আল্লাহ তাদের মোটেও ক্ষমা করবেন না? তখন অবতীর্ণ হয়- ‘হে রাসূল! তুমি তাদের কেউ মারা গেলে কোন দিন তার জানাযার ছালাত আদায় করবে না এবং তার কবরের পাশে দাঁড়াবে না’। তারপর থেকে তিনি মুনাফিকদের জানাযার ছালাতে অংশ নেওয়া বন্ধ করে দেন।[33]

শেষ কথা :

পূর্বের বর্ণনা থেকে মুনাফিকীর বিপদ সম্পর্কে ধারণা সুস্পষ্ট হয়েছে। আসলে মুনাফিকী একটি প্রাণঘাতী মানসিক রোগ এবং নিন্দনীয় স্বভাব। নবী করীম (ছাঃ) এহেন স্বভাবের অধিকারীকে বিশ্বাসঘাতক, আত্মসাৎকারী, মিথ্যুক ও পাপাচারী হিসাবে আখ্যায়িত করেছেন। কেননা মুনাফিক মনে যা লুকিয়ে রাখে, বাইরে তার উল্টোটা প্রকাশ করে। সে সত্য বলছে বলে দাবী করে অথচ সে জানে যে সে মিথ্যুক। সে দাবী করে আমানত রক্ষা করার, অথচ সে ভালই জানে যে সে তা আত্মসাৎকারী। সে আরও দাবী করে যে, সে অঙ্গীকার পালনে অত্যন্ত দৃঢ় অথচ সে অঙ্গীকার ভঙ্গকারী। সে তার প্রতিপক্ষের নামে বানোয়াট সব দোষ বলে বেড়ায় অথচ সে ভাল করেই জানে তার এসব দোষারোপের মাধ্যমে সে পাপাচারী হচ্ছে। সে মারাত্মক অপরাধ করছে। সুতরাং তার স্বভাব চরিত্রের পুরোটাই ধোঁকা ও প্রতারণার উপর দন্ডায়মান। এমন যার অবস্থা তার বেলায় বড় মুনাফিক হয়ে যাওয়ার ভয় উড়িয়ে দেওয়া যায় না। কেননা নিফাকে আমালী বা আমলভিত্তিক মুনাফিকী যদিও ঐসব পাপের অন্তর্ভুক্ত যদ্দরুন বান্দা ঈমান থেকে খারিজ হয়ে যায় না, তবুও যখন তা বান্দার ওপর জেঁকে বসে এবং তার আচরণকে প্রতারণার জালে আটকে ফেলে এবং তা অনেক্ষণ চলতে থাকে তখন আল্লাহ তাকে বড় ও আসল মুনাফিকের খাতায় নাম তুলে দিতে পারেন। তার আমলের শাস্তি হিসাবেই তার অন্তর থেকে ঈমান খারিজ করে সেখানে মুনাফিকীর জায়গা তিনি করে দেন।

আমরা আল্লাহর নিকট দো‘আ করি- তিনি যেন আমাদের অন্তরের দোষ-ত্রুটিকে সংশোধন করে দেন এবং প্রকাশ্য-অপ্রকাশ্য সকল ফিৎনা-ফাসাদ থেকে আমাদের দূরে রাখেন। আর আল্লাহ তা‘আলা রহমত ও শান্তি বর্ষণ করুন, আমাদের নবী মুহাম্মাদ (ছাঃ)-এর উপর।


মূল : শায়খ মুহাম্মাদ ছালেহ আল-মুনাজ্জিদ
অনুবাদ : মুহাম্মাদ আব্দুল মালেক

তথ্যসূত্র:
[14]. তিরমিযী হা/২৪১, আলবানী এটিকে হাসান বলেছেন।

[15]. তুহফাতুল আহওয়াযী ২/৪০।

[16]. তিরমিযী হা/২৬৮৪, আলবানী এটিকে ছহীহ বলেছেন।

[17]. তুহফাতুল আহওয়াযী ৭/৩৭৮।

[18]. মুসলিম হা/২২৩।

[19]. শরহে নববী মুসলিম ৩/১০১।

[20]. হিলয়াতুল আওলিয়া ২/৩৩৮।

[21]. মুসলিম হা/১৯১০।

[22]. শরহে নববী, মুসলিম ১৩/৫৬।

[23]. আল-ওয়াবিল আছছাইয়িবু, পৃঃ ১১০।

[24]. সিয়ারু আ‘লামিন নুবালা ৬/৩৮২, যাহাবী সনদ ছহীহ বলেছেন।

[25]. বুখারী হা/১৭; মুসলিম হা/৭৪।

[26]. মুসলিম হা/৭৮ ‘ঈমান’ অধ্যায়।

[27]. বুখারী হা/৭১১৩।

[28]. জামিউল বায়ান ২০/২০২।

[29]. ঐ, ৮/৫১৫।

[30]. ঐ, ৯/১৯০।

[31]. ঐ, ৭/১৪০।

[32]. আবুদাঊদ হা/৪৯৭৭, আলবানী এটিকে ছহীহ বলেছেন।

[33]. বুখারী হা/৫৭৯৬।

> স্বপ্ন যখন সত্য হল

রাসুলুল্লাহ (সা) এর এক খালা ছিলেন। নাম, উম্মে হারাম বিনতে মিলহান (রা)।
রাসুল (সা) প্রায়ই তার বাসায় থাকতেন, দুপুরে ঘুমুতেনও মাঝে মধ্যে। একদিন খালার বাসায় খাওয়ার পর তিনি শুলেন, খালা উম্মে হারাম তার চুলে উঁকুন বেছে দিচ্ছিলেন। ঘুমিয়ে পড়লেন নবী (সা)।

এটা নিশ্চয়ই অনেকের জানা আছে, আল্লাহ তাঁকে স্বপ্নে অনেক সময় ভবিষ্যতে কী হবে তা দেখাতেন, খণ্ড খণ্ড।

হঠাৎ তার ঘুম ভেঙে গেল আর উঠে বসলেন তিনি। মুচকি হাসছেন। উম্মে হারাম জিজ্ঞেস করলেন, ‘ইয়া রাসূলুল্লাহ! হাসির কারণ কি?’

‘আমার উম্মাতের কিছু লোককে আল্লাহর পথে জিহাদরত অবস্থায় আমার সামনে পেশ করা হয়। তারা এ সমুদ্রের মঝে এমনভাবে আরোহী যেমন বাদশাহ তখতের উপর অথবা বলেছেন, বাদশাহর মত তখতে উপবিষ্ট।’

“ইয়া রাসূলুল্লাহ! আল্লাহর কাছে দু’আ করুন যেন আমাকে তিনি তাদের অন্তর্ভুক্ত করেন।“ নবিজী দুয়া করে আবার শুয়ে পড়লেন।

কিছুক্ষণ পর আবার ঘুম ভেঙে হাসিমুখে রইলেন, এবারো খালা জিজ্ঞেস করলেন, ‘ইয়া রাসূলুল্লাহ! আপনার হাসার কারণ কি?’

“আমি দেখলাম তারা যুদ্ধ করছে আল্লাহ্‌র রাস্তায়।”

ইয়া রাসূলুল্লাহ! আপনি আল্লাহর কাছে দু’আ করুন, যেন আমাকে তিনি তাদের অন্তর্ভুক্ত করেন। রাসুল বললেন, “তুমি তো প্রথম দলের মধ্যেই আছ।“

বহুকাল পরে, রাসুলের মৃত্যুর পর, ইসলামি রাজ্য যখন সিরিয়া ছুঁই ছুঁই করছে, তখন মুয়াবিয়া (রা) গিয়ে উমার (রা)কে বুঝানোর চেষ্টা করলেন, সামুদ্রিক যুদ্ধে সাইপ্রাসকে পরাজিত করতে হবে, কারণ বাইজান্টিন সাম্রাজ্য বারবার সাইপ্রাসকে ব্যবহার করে ইসলামি রাজ্যকে আক্রমণ করছে।
কিন্তু, উমার রাজি হলেন না, কারণ নৌসমরে এ কোনই অভিজ্ঞতা নাই মুসলিমদের।

উমার মারা যাবার পর যখন উসমান (রা) খলিফা হলেন, তখন মুওাবিয়া তাঁকে রাজি করিয়ে ফেললেন।

মুওাবিয়া (রা) এই অভিযানের জন্য সেনাপতি নির্বাচন করলেন উবাদা বিন সামিত (রা)কে। উবাদা (রা) এর নেতৃত্বে প্রথমবারের মত মুসলিম নৌবাহিনী পাঠানো হল। সাইপ্রাসে।

কাকতালীয় ব্যাপার ছিল, উবাদার স্ত্রী ছিলেন সেই উম্মে হারাম (রা)। তিনি সেচ্ছায় স্বামীকে সঙ্গ দেবার জন্য তার সাথে রওনা হলেন। ঠিক যেমনটা রাসুল (সা) স্বপ্নে দেখেছিলেন।

যেদিন জাহাজগুলো তীর ছেড়ে চলে যাচ্ছিল আর সবাই তাদের বিদায় দিতে এসেছিল, সেই দৃশ্যের দিকে তাকিয়ে জাহাজের কিনারে দাঁড়ানো উম্মে হারামের গাল বেয়ে অশ্রু ঝড়ে পড়ছিল। তিনি বিড়বিড় করছিলেন, “আপনি সত্য বলেছিলেন, রাসুলুল্লাহ (সা)”

দ্বীপের কাছে পৌঁছানোর পর কোস্টগার্ডরা অ্যাটাক করে তাদের। কোস্ট গার্ডদের পরাজিত করার পর তীরে নামলেন তাঁরা।

নামার পর তিনি ঘোড়ায় চড়ে এগুচ্ছিলেন। হঠাৎ ঘোড়াটা ভয় পেয়ে লাফ দেয়, আর উম্মে হারাম পড়ে যান ঘোড়া থেকে। আহত হয়ে মারা যান তিনি। ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন।

তাঁর লাশ যখন নিতে এলেন অন্যরা, দেখলেন, তিনি মুচকি হাসতে হাসতে মারা গেছেন। তিনি স্বপ্নের বাকিটাও সত্য হতে দেখে গেছেন…
যেখানে তিনি মারা গিয়েছিলেন, ঠিক সে জায়গায় আজ উম্মে হারাম মসজিদ, তাঁর স্মরণে।

আমর ইবনে আ’স (রা) ও যিশুর ভাঙ্গা মূর্তি

> দ্বিতীয় খলিফা হজরত উমর (রা)-এর খেলাফতকাল।

মিসরের শাসনকর্তা হিসেবে তখন হজরত আমর ইবনে আ’স (রা) দায়িত্ব পালন করছিলেন। আর, তখন খ্রিস্টান সাম্রাজ্য চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিলো ইসলাম ধ্বংস করার। রোমান বাহিনী শেষ পর্যন্ত আলেক্সান্দ্রিয়া দখলেরও পায়তারা করে। কিন্তু ওদিকে সুশাসক আমর ইবনে আ’স (রা) নিষ্ঠার সাথে শাসন করছিলেন। খ্রিস্টানদের শাসন করতেন নিজেদের ধর্মগ্রন্থ থেকেই। খ্রিস্টানরা স্বাধীনভাবে নিজেদের ধর্ম পালন করতে পারত।

একদিন সকালবেলা।

আলেকজান্দ্রিয়ার খ্রিষ্টান পল্লীতে হইচই পড়ে গেল। সবাই দেখা গেল বাজারে জটলা হয়ে আছে। উত্তপ্ত বাক্য বিনিময় চলছে। সেখান থেকে খ্রিস্টানদের স্থানীয় আর্চবিশপ আমর ইবনে আ’স এর বাসভবনে গেলেন বাজারের ঘটনা সল্ভ করার জন্য। তাঁর সাথে আরও অনেকেই গেলেন।

সেখানে গিয়ে বিশপ জানালেন, কেউ একজন বাজারের যিশু খ্রিষ্টের মার্বেলের মূর্তির নাক গত রাতে ভেঙে ফেলেছে। এ মূর্তিটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ ছিল তাদের জন্য। খ্রিষ্টানরা ধরে নিয়েছে যে এটা মুসলমানদের কাজ। তারা উত্তেজিত হয়ে উঠেছে।

আমর ইবেন আ’স এ কথা শুনে অত্যন্ত দু:খিত হলেন। তিনি বললেন, “আমি খুবই লজ্জিত, ব্যথিত। সত্যি কথা, ইসলামে মূর্তিপূজা জায়েজ না। কিন্তু, অন্য ধর্মের উপাস্যকে গালি দেয়া পর্যন্তও হারাম। প্লিজ, আপনি মূর্তিটা repair করে নিন। আমি পূর্ণ খরচ দেব।”

কিন্তু বিশপ বললেন, “এ মূর্তি রিপেয়ার করা যাবে না।”

আ’স বললেন, “তবে নতুন করে বানান। আমি খরচ দেব।”

“না, সেটাও হবে না। আপনি জানেন, যীশু ঈশ্বরপুত্র। তাঁর মূর্তির এমন অবমাননা সহ্য করা যায় না। একটাই ক্ষতিপূরণ, আমরা আপনাদের মুহাম্মাদ (স) এর মূর্তি বানিয়ে সেটার নাক ভাঙব।”

রাগে জ্বলে গেল আ’স এর গা। তিনি কিছুক্ষণ নীরব থেকে খ্রিষ্টান বিশপকে বললেন, “আপনি যা বললেন সেটা সম্ভব না। আমাদের সম্পদ, পরিবারের চেয়েও মুহাম্মাদ (স)কে বেশি ভালবাসি। আমার অনুরোধ, এ প্রস্তাব ছাড়া অন্য যেকোনো প্রস্তাব করুন আমি রাজি আছি। আমাদের যেকোনো একজনের নাক কেটে আমি আপনাদের দিতে প্রস্তুত, যার নাক আপনারা চান।”

খ্রিষ্টান নেতারা সবাই এ প্রস্তাবে সম্মত হলো।

পরদিন খ্রিষ্টান ও মুসলমান বিরাট এক ময়দানে জমায়েত হলো। মিসরের শাসক সেনাপতি আমর রা: সবার সামনে হাজির হয়ে বিশপকে বললেন, “এ দেশ শাসনের দায়িত্ব আমার। যে অপমান আজ আপনাদের, তাতে আমার শাসনের দুর্বলতা প্রকাশ পেয়েছে। তাই এই তরবারি গ্রহণ করুন এবং আপনিই আমার নাক কেটে দিন।”

এ কথা বলেই বিশপকে একখানি ধারালো তরবারি হাতে দিলেন, বিশপ সেটা পরীক্ষা করলেন। জনতা স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে, খ্রিষ্টানরা স্তম্ভিত। চারদিকে থমথমে ভাব। সে নীরবতায় নি:শ্বাসের শব্দ করতেও যেন ভয় হয়।

হঠাৎ সেই নীরবতা ভঙ্গ করে একজন মুসলিম সৈন্য এগিয়ে এলো। চিৎকার করে বলল, “আমিই দোষী, সেনাপতির কোনো অপরাধ নেই। আমিই মূর্তির নাক ভেঙেছি। এইত, আমার হাতেই আছে সে নাক। তবে মূর্তি ভাঙার কোনো ইচ্ছা আমার ছিল না। মূর্তির মাথায় বসা একটি পাখির দিকে তীর নিক্ষেপ করতে গিয়ে এ দুর্ঘটনা ঘটেছে।”

সৈন্যটি এগিয়ে এসে বিশপের তরবারির নিচে নাক পেতে দিল। স্তম্ভিত বিশপ! নির্বাক সবাই। বিশপের অন্তরাত্মা রোমাঞ্চিত হয়ে উঠল।

তরবারি ছুড়ে বিশপ বললেন, “ধন্য সেনাপতি, ধন্য হে বীর সৈনিক, আর ধন্য আপনাদের মুহাম্মদ (সা:), যার মহান আদর্শে আপনাদের মতো মহৎ উদার নির্ভীক ও শক্তিমান ব্যক্তি গড়ে উঠেছে। যীশু খ্রিষ্টের প্রতিমূর্তিই অসম্মান করা হয়েছে সন্দেহ নেই, কিন্তু তার চেয়েও অন্যায় হবে যদি অঙ্গহানি করি।”

কী অসাধারণ ছিল আমর ইবনে আ’সের ঈমান!

{রেফারেন্সঃ ওয়াকিদি, হিরাক হার; বর্ণিতঃ খান, Anecdotes from Islam, পৃষ্ঠা ১৯৫-৭}
আমর ইবনে আ’স ১৪ ফেব্রুয়ারি ৫৯২ সালে মক্কায় জন্মগ্রহণ করেন। ৬২৯ সালে খালিদ বিন ওয়ালিদের সাথেই ইসলাম গ্রহণ করেন। মুহাম্মাদ (স) এর ঘনিষ্ঠ সাহাবী। ৬৪০ সালে মিসরের গভর্নর হন। আফ্রিকার প্রথম মসজিদ তিনি প্রতিষ্ঠা করেন। মারা যান ৬ জানুয়ারি, ৬৬৪ সালে মিসরে ৭২ বছর বয়সে।

ভাল লাগলে শেয়ার করবেন, আর ভবিষ্যতে কোন কোন সাহাবীর কাহিনী জানতে চান আমাদের জানাবেন।